পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৩১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


জীবন সন্ধানের তাত্ত্বিক

প্রতিটি তাৎপর্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনীয়: এই উচ্চারণ যাঁর, সেই মিখায়েল মিখায়েলোভিচ বাখতিন জীবন ও তত্ত্বের যুগলবন্দি রচনা করেছেন যেন। সোভিয়েত ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে তাঁর জীবন প্রবাহিত হয়েছে বলে একদিকে তাঁর জীবনযাপন এবং অন্যদিকে তাঁর ভাববিশ্ব বিচিত্র উচ্চাবচতায় তরঙ্গায়িত হয়ে উঠেছিল। ১৮৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর যে-যাত্রার সূচনা হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ মার্চ তাতে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে। বাখতিনের চিন্তাসূত্র অনুযায়ী তাঁর জীবনের ঐ সমাপ্তিও আপাত-সমাপ্তি মাত্র, অন্তত অবসান নয় কোনো। কেননা বাখতিনের জীবন-ব্যাপী সন্ধান ও সংগ্রামের তাৎপর্য মৃত্যুর দ্বিবাচনিক দর্পণে আমাদের কাছে আজ ক্রমশ নতুন প্রতীতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। বাখতিনের তত্ত্ব-ভাবনায় কোনো নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রকরণ নেই, এ নিয়ে আক্ষেপেরও কারণ নেই কিছু। এত অজস্র বিনির্মাণ ঘটেছে বাখতিনের সময়ে ও সমাজে যে, কোনো ধরনের রৈখিকতা তাতে আরোপ করা অসম্ভব। ইতিহাসের ছন্দে যেহেতু তাঁর ব্যক্তিজীবনের লয়ও গাঁথা হয়ে গেছে, বাখতিন বারবার জিজ্ঞাসা ও সত্যকে পরখ করে দেখেছেন। জেনেছেন, এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে প্রবহমান জীবনে অনুসন্ধিৎসাকে অক্ষুণ্ণ রাখাই মানুষের সবচেয়ে বড়ো দায়। রৈখিকতার নিয়ম তাতে বজায় থাকল কি থাকল না এবিষয়ে উদ্বিগ্ন তিনি ছিলেন না কখনো।

 অবশ্য এতে গবেষক ও ভাষ্যকারদের প্রচুর অসুবিধে হয়েছে, সংশয়ও জেগেছে নানা রকম। এতবার যিনি নিজেকে ভেঙেছেন, তাঁর কোন্‌ বিশ্বাসকে প্রধান বলে মনে করব এবং কোনগুলিকে তুলনামূলকভাবে মনে করব অপ্রধান—এবিষয়ে বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে জোর বিতর্ক চলছে। তাছাড়া বাখতিনের চিন্তা যেহেতু নানাধরনের তত্ত্ব-কথার সীমানাকে ছুঁয়ে গেছে, সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে তাঁর বক্তব্য বিচিত্রভাবে গৃহীত ও ব্যাখ্যাত হচ্ছে। অনেক সময় বাখতিনের সামগ্রিক ভাববিশ্ব আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, বড়ো হয়ে উঠছে কোনো উজ্জ্বল ও সুনির্বাচিত বিচ্ছিন্ন অংশ। ছ’জন অন্ধের হাতি দেখার বিখ্যাত গল্পটা এখানে হয়তো মনে আসে। সত্যের দ্বিবাচনিক স্বরূপ প্রতিষ্ঠায় যিনি ক্লান্তিহীন ছিলেন, তাঁর তত্ত্ববিশ্বের সঙ্গে জীবনের সমান্তরাল অবস্থান কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ সে-কথা ভালোভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বভাবত বাখতিনের জীবনব্যাপী আত্ম-উন্মোচন এবং সেই সূত্রে বিশ্ব-উন্মোচন আমাদের মনোযোগের বিষয় হতে পারে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর প্রধানতম বক্তব্য এই যে পার্থক্য ও সমান্তরালতার উপলব্ধি অস্তিত্বের মৌল প্রাক্‌শর্ত। এর কারণ, বাখতিন জীবন-ব্যাপী অভিজ্ঞতা দিয়ে জেনেছিলেন, একটি জগৎ থেকে ক্রমাগত উঠে আসে অনেক জগতের আদল এবং এক জীবনের অন্তরালে রয়ে যায় অজস্র বিকল্প-জীবনের সম্ভাবনা। স্বভাবত এদের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে, তাৎপর্য এক নয়, অনেক। এই অনেকান্তিকতা ভেঙে দিচ্ছে সব রৈখিকতা এবং একবাচনিক আয়তন। ফলে জীবন থেকে যে -প্রতিবেদন গড়ে উঠছে অহরহ, তার মধ্যে একক উচ্চারণ অসম্ভব। দৃষ্টিকোনের ভিন্নতা থেকে অনিবার্যভাবে জেগে উঠছে

২৭