পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৩২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

উচ্চারণের বহুত্ব। বস্তুত সাম্প্রতিক পৃথিবীতে মিখায়েল বাখতিনের মতো খুব কম চিন্তাবিদই পার্থক্যের বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন অস্তিত্বের সমান্তরাল অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। উচ্চারণের বহুত্ব তাঁর বিশ্বাসের বিষয় ছিল না কেবল, তাঁর জীবনের অজস্র আপাত-স্ববিরোধিতা ও কূটাভাসের মধ্যেও অনেকার্থ-দ্যোতনার প্রত্যয় অদ্ভূতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

 বাখতিনের ভাববিশ্বে একক অস্তিত্ব যতখানি সত্য, ঠিক ততখানি অনিবার্য অনেকের প্রাসঙ্গিকতা। সম্ভবত এইজন্যে সারা জীবন ধরে তিনি মানবিক বিদ্যার নানা বিচিত্র পথে বিচরণ করেছেন। কোথাও তিনি নব্য-কান্টবাদী দর্শনের ঐতিহ্য স্বীকার করে নিয়েছেন, কোথাও মার্ক্সীয় চেতনার অনুষঙ্গে নিজের যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন, আবার কোথাও একধরনের বস্তু-অতিযায়ী চিন্তা দ্বারা প্রাণিত হয়েছেন। সুতরাং অনেকটা মৌলিকস্তরেই, পাঠকৃতির গভীরে, একাধিক বাখতিনের অবয়ব ফুটে উঠেছে; এইজন্যে বাখতিন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দেখা যায় পরস্পর-বিরোধী অবস্থান। আর, এই সংশয়ের জন্যে বরং বাখতিনকে দায়ী করতে হয়। কেননা লেনিনগ্রাদে থাকার সময়ে যারা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, এমন কয়েক জনের নামের আড়ালে আত্মগোপন করেছিলেন তিনি। অবশ্য এ সম্পর্কেও কোনো নিঃসন্দিগ্ধ অবস্থানে পৌঁছানো সহজ নয় আজও।

 একুশ শতকের সূচনাবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আজ একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে বিশ শতকের প্রধান চিন্তাবিদদের মধ্যে বাখতিন অন্যতম নন শুধু, অগ্রণীও। বিশেষত গত কয়েক বছরে মানবিক চিন্তার বিভিন্ন অভিব্যক্তির মধ্যে প্রথাগত সীমানা যখন দ্রুত মুছে যাচ্ছে, সে-সময় বাখতিনের চিন্তা অনুসরণ করে আমাদের মনে হয়, তিনি বুঝিবা মানববিশ্বের এই সম্ভাবনার দিকে সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। সংশয়-পীড়িত এক সময়-পর্বে থেকেও জীবন ও মননের সমাপ্তিবিহীন সন্দর্ভ ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। এইজন্যে ভাষাতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, ঐতিহাসিক নন্দনতত্ত্ব, সত্তা-সম্পর্কিত দার্শনিক জিজ্ঞাসা—এই সবই তাঁর প্রতিবেদনে আত্তীকৃত হয়েছে। নব্য কান্টবাদ, প্রকরণবাদ, ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব যেমন তাঁর কৌতুহল আকর্ষণ করেছে, তেমনি ডস্টয়েভস্কি, গ্যয়ঠে, রাবেলের মতো সাহিত্যস্রষ্টা সম্পর্কে তাঁর মৌলিক বিশ্লেষণ সমালোচনা-তত্ত্বের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক পাঠককেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্ব, নারীচেতনাবাদ ও আকরণোত্তরবাদী সাহিত্যতত্ত্ব বাখতিনের বক্তব্য পুনঃপাঠ করে নতুন নতুন তাৎপর্য আবিষ্কার করে চলেছে। স্বভাবত আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, বাখতিনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রচ্ছন্ন অনেকার্থদ্যোতনার স্বরূপ ঠিক কী যার ফলে নৃতত্ত্ববিদ, লোকতত্ত্ববিদ, ভাষাতাত্ত্বিক এবং সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা তাঁদের নিজস্ব জিজ্ঞাসার সূত্র ও সমর্থন বাখতিনের বিভিন্ন সন্দর্ভে খুঁজে পাচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাব পেতে চাই যদি, তাঁর জীবনের পর্ব থেকে পর্বান্তরে ছেদ ও ধারাবাহিকতার দ্বিবাচনিক সম্পর্ক কীভাবে নানা স্বরন্যাসে ব্যক্ত হলো—তা সতর্কভাবে বুঝে নিতে হবে।

 আসলে বাখতিন পৌঁছাতে চান মানবিক চেতনার এক অনন্য সমবায়ী অভিব্যক্তিতে যাকে বলা যেতে পারে ‘দার্শনিক নৃতত্ত্ব’। বিভিন্ন উৎস-জাত স্রোতোধারা এসে মিলিত হোক ঐ মোহনায়, এই চেয়েছেন তিনি। সমস্ত কিছুর ওপরে বাখতিন গুরুত্ব আরোপ করেছেন মানবিক উচ্চারণের সামাজিক স্বভাবে কেননা তার অস্খলিত প্রত্যয় এই যে,

২৮