পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৬২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

তাৎপর্য বুঝতে পারি শুধু নানা ধরনের ও নানা পর্যায়ের সক্রিয়তার প্রত্যক্ষ অনুষঙ্গে। আমরা কেউ একে অপরের অবস্থান পুনরাবৃত্তি করতে পারি না বলে তাকে সুনির্দিষ্ট বলছি। মহাবিশ্বে যেমন প্রতিটি গ্রহ-তারা-উপগ্রহ-ধূমকেতু-ছায়াপথের অবস্থান বিপুল আপেক্ষিকতার প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট, সত্তার অবস্থানও তাই। আবার এই অমোঘতার মধ্যেও অনবরত রূপান্তরিত হচ্ছে অস্তিত্ব। পদার্থ জগতের মতো অন্যান্য মানবিক ও প্রাকৃতিক অস্তিত্বের দৃশ্য ও অদৃশ্য আততিতে সত্তার রূপান্তর ঘটছে অহরহ। তবে সবই ঘটছে প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট অবস্থানের ভিত্তিতে। বস্তুত প্রত্যেকের জীবনেই প্রকৃত উদ্যোগ বা ঘটনার প্রকল্প যেভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেভাবেই সত্তার নিজস্ব সংরূপ সংগঠিত হচ্ছে। এইজন্যে অস্তিত্ব মূলত অনুষ্ঠান, সংগঠন। অপর সব সত্তা ও জগতের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক গ্রন্থনায় একমাত্র সূত্রধার যেহেতু অস্মিতার পরিসর, সব সাফল্য ও ব্যর্থতার জন্যে তাকেই দায়ী থাকতে হয়।

 প্রতিটি সত্তা থেকে নিয়ত উৎসারিত সক্রিয়তা অস্মিতা ও অপরতার মধ্যে সর্বদা নিশ্চিত সংযোগ গড়ে তুলতে পারছে, তা কিন্তু নয়। তৈরি হতে-না-হতে হারিয়ে যাচ্ছে সম্পর্ক কিংবা সম্পর্ক তৈরি হওয়ার অবকাশ দেখা দিতে-না-দিতে স্খলিত হয়ে যাচ্ছে বিন্যাস। এই যে হারিয়ে যাওয়া ও স্খলন, তাদের নিরন্তর অভিঘাতে হয়তো উদ্ভূত হচ্ছে সত্তার সক্রিয়তা। তাহলে সংযোগকে বলতে পারি ঘটমান সম্ভাবনা; অপরতা ও অস্মিতার পারস্পরিক নির্ভরতা কিংবা উন্মুখতার সূত্রে যাকে বুঝি, যাকে চিনি। কিংবা পুরোপুরি বুঝতে বা চিনতে কি পারি কখনো? তাহলে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে নবায়মান জিজ্ঞাসা ও মীমাংসাপ্রয়াসের সূত্রে সংযোগের নির্মাণই জীবন। সমস্ত ব্যক্তিসত্তা ও সমস্ত অপরতার দ্বিবাচনিকতায় যত প্রতিবেদনের আদল তৈরি হচ্ছে, তাদের নির্যাস হলো ঐ সংযোগের অনুভব। আর, অনুভবের প্রকাশকে বলি উচ্চারণ। বলা ভালো, উচ্চারণ কেবল শব্দে বা পাঠকৃতিতে থাকে না; তা থাকে চিন্তায়, উদ্যমে। লেখকসত্তার ধারণা এইসব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চেতনার পক্ষে অস্মিতা যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, পাঠকৃতির পক্ষে লেখক-স্রষ্টা ততটুকু অপরিহার্য। বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যখন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, স্বতন্ত্র অস্তিত্বের চেতনাও ব্যক্ত হচ্ছে। ‘আমি’ সর্বনামটি আমি ব্যবহার করতে পারি যখন বাচনকে গ্রহণ করার মতো কোনো একটি ‘তুমি’ উপস্থিত রয়েছে। সম্বোধন মানেই গ্রহীতা-সম্বোধিতের উপস্থিতি; আর, ভাষা মানে সম্বোধ্যমানতার ক্রিয়া ও প্রকরণ। সম্বোধকের অস্তিত্বের কেন্দ্র হলো ‘আমি’ সর্বনামের উপস্থিতি। স্বভাবত উপস্থিতি মানে নির্দিষ্ট পরিসর ও সময়ের ঘোষণা। একই সঙ্গে তা অন্যান্য উপস্থিতি থেকে স্পষ্ট পার্থক্যপ্রতীতিরও উপলব্ধি। এইসব অপর অস্তিত্ব যুগপৎ বস্তু এবং চিহ্ন। সক্রিয় উদ্যমের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সংযোগ তৈরি করে যাওয়া তাই বস্তুবিশ্ব ও চিহ্নবিশ্বে অবধারিত। না লিখলেও চলে, সম্বোধ্যমানতা আর মীমাংসা-প্রয়াসের ক্রিয়াকে অক্ষুণ্ণ রাখাই জীবনের, চেতনার, ভাষার শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান।


তিন

যা-কিছু যথাপ্রাপ্ত এবং যা-কিছু সম্ভাব্য, তাদের মধ্যে নিরন্তর বিনিময় চলে বলেই তো জীবনের আর সাহিত্যের পাঠ চূড়ান্ত হয় না কখনও। আসলে সম্বোধ্যমানতা নিয়ত

৫৮