পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১৮d বিভূতি-রচনাবলী রাজা কিছু নেই, আমরা বাপ-দাদাদের মুখ থেকে শুনে আসছি চিরকাল—নেই বলে উড়িয়ে দিলেই—অবিশ্যি তোমার মেয়ে ঐ নিবান্দা পরীর মধ্যে একা থাকে, সাহস বলিহারি যাই— আমাদের বাড়ির এরা হলে দিনমানেই থাকতে পারত না— এদের কথাবাৰ্ত্তার এই অংশটা সতীশ কলার কানে গিয়েছিল, সে খন্দেরকে তেল-মেপে দিতে দিতে বললে, এখন অবেলায় ও কথাডা বন্ধ করন বাবাঠাকুর, দরকারকি ওসব কথায় ? চেরকাল শনে আসছি, বাপ পিতেমো পহুজন্ত বলে গিয়েছে—গড়ের বাড়িই পড়ে আছে কতকাল অমনি হয়ে তার ঠিক ঠিকানা নেই—আমার বয়েস এই তিন কুড়ি চার যাচ্ছে, আমি তো ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি ঠিক অমনি ধারা—কেদার দাদাঠাকুরের বয়েস আমার চেয়ে কত কম—আমি ওনাকে এটকখানি দেখেছি— জগন্নাথ চাটুতেজ বললেন, আরে তোমার তো মোটে চৌষট্টি সতীশ, আমার ঠাকুরদা মারা গিয়েছিলেন আমার ছেলেবেলায়, তিনি বলতেন তাঁর ছেলেবেলায় তিনিও গড়বাড়ি আমনি ধারা জঙ্গল আর ইটের ঢিবি দেখে আসছেন, তাঁর মুখেও আমি উত্তর দেউলের ওকথা শুনেছি —কেদার রাজা কি জানে ? ও কত ছোট আমাদের চেয়ে । কেদার বলে উঠলেন, ছোট বড় নই দাদা, এই তিপান্ন যাচ্ছে— জগন্নাথ বললেন,—আর আমার এই থাটি ষাট কি একষট্টি—তা হলে হিসেব করে দেখো কতদিন হ’ল, আমার যখন পনেরো তখন ঠাকুরদা মারা যান, তখন তাঁর বয়েস নব্বইয়ের কাছাকাছি—এখন হিসেব করে দেখ ঠাকুরদাদার ছেলেবেলা,সে কতদিনের কথা—কত দিনের হিসেব পেলে দেখো— কেদার তেলের আশা ত্যাগ করে উঠে পড়লেন—কোনো উপায় নেই। কারো সামনে তিনি ধারের কথা বলতে পারবেন না—বিশেষ করে জগন্নাথ চাটুজের সামনে । সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়েছে । গেয়োখালির হাট থেকে ফিরবার পথে গড়ের সদর দেউড়ির দিকে গেলে ঘরে হয় বলে পাবদিক দিয়েই ঢুকলেন কেদার—যে দিকটাতে খালে এখনও জল আছে। এদিকটাতেই বড় বড় ছাতিম গাছ আর ঘন বন । এক জায়গায় মাত্র হাঁটু জল খালে, কাত্তিক মাসে কচুরি পানার নীলাভ ফুল ফুটে সমস্ত খালটা ছেয়ে ফেলেছে— এতটুকু ফাঁক নেই কোথাও—অন্ধকার সন্ধ্যাতেও শোভা যেন আরো থলেছে । খাল পেরিয়ে উঠে গড়ের মধ্যে ঢুকেই ছাতিম বনের ওপারে ডান দিকে এক জায়গায় ধংসস্তাপের থেকে একটু দরে গোলাকৃতি গম্বুজের মত ছাদওয়ালা ছোট গোছের মন্দির– এরই নাম এ গাঁয়ে উত্তর দেউল । কেন এ নাম তা কেউ জানে না, সবাই গনে আসছে চিরকাল, তাই বলে । 釀 উত্তর দেউলের পাশ দিয়ে ছোট্ট পায়ে-চলার পথ বাদড়নখী কাঁটার ঝোপের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ছাতিম ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বাদড়নখী ও জংলী বনমরচে ফুলের ঘন সবাস । বন বt-ধারে বেশ ঘন আর অন্ধকার । গড়ের এখানকার দশ্যটি সত্যিই ভারী সন্দের । 藝 কেদার একবার গম্বুজাকৃতি মন্দিরটার দিকে চাইলেন। আজকেন যেন তাঁর গা ছমছম করতে লাগল। অন্ধকার ঘরটার মধ্যে সামান্য মদ প্রদীপের আলো—শরৎ এই সন্ধ্যার সময় প্রতিদিনের মত সন্ধ্যাদীপ জালিয়ে দিয়ে গিয়েছে—এটা কেদার রাজার বংশের নিয়ম, আজন্ম দেখে আসছেন তিনি, উত্তর দেউলে বাতি দিয়ে এসেছেন চিরকাল কেদারের মা, ঠাকুরমা এবং সম্ভবত প্রপিতামহী । কেদারের আমলেও দেওয়া হয় ।