পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৪৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩৪২ বিভূতি-রচনাবলী তার পর ওরা বনের মধ্যে মেটে আল তুলতে গিয়ে অনেক বেলা পর্যন্ত রইল। বনের মধ্যে এক জায়গায় একটা পাথরের থামের ভাঙা মঙুেটা মাটিতে অন্ধে’ক পুতে আছে । রাজলক্ষী সেটার ওপরে গিয়ে বসলো। পাথরের গায়ে সামুদ্রিক কড়ির মত বিট কাটা, মাঝে মাঝে পদ্মফুল এবং একটা দড়ি। আবার কড়ি, পদ্ম ও দাঁড়–মালার আকারে সারা থামটা ঘরে এসেছে । নিচের দিকে একরাশ কেচোর মাটি বাকী অংশটুকু ঢেকে রেখেছে । রাজলক্ষী চেয়ে চেয়ে বললে, এই নক্সাটা কেমন চমৎকার শরৎদি ? বনলে ভাল হয়— দেখে নাও— শরৎ বললে, এর চেয়েও ভাল নক্সা আছে ওই অশ্বখ গাছটার তলায়—একটা খিলেন ভেঙে পড়ে আছে, তার ইটের গায়ে । কিন্তু বন্ড বন ওখানে—আর কাঁটা গাছ । —তোমাদেরই সব তো—একদিন শুনেছি গড়বাড়ির চেহারা অন্যরকম ছিল । না ? —কি জানি ভাই, ও-সবের খবর আমি রাখি নে। আজকাল যা দেখছি, তাই দেখছি । তেল জোটে তো নন জোটে না, নতুন জোটে তো চাল জোটে না। তার পর শরৎ কি ভেবে আনন্দপণ কণ্ঠে বললে, সত্যি রাজি, খুব খুশী হয়েছি তোর বিয়ের কথা শুনে। কত যে ভেবেছি, কাশীতে থাকতে কতবার ভাবতাম, ভাল সম্বন্ধ পাই তো রাজির জন্যে দেখি । একবার দশাশ্বমেধ ঘাটে একটা চমৎকার ছেলে দেখে ভাবলাম, এর সঙ্গে যদি রাজির বিয়ে দিতে পারতাম, তবে— রাজলক্ষী চুপ করে রইল । সে যেন কি ভাবছে । শরৎ বললে, প্রভাসদার দেওয়া সেই মখমলের বাক্সটা আছে রে ? —হ । সেনাটা সব খরচ হয়ে গেছে—আর সব আছে। দ্যাখো শরৎদি, সত্যি সতিা একটা কথা বলি, আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না তোমায় ছেড়ে—আমি একবার বলেছি, আবার বলছি । মনের কথা আমার । তার পর রাজলক্ষী উঠে ধীরে ধীরে শরতের গলা জড়িয়ে ধরে বললে, শরৎদি, তুমি আমায় ভালবাসো ? শরৎ তাকে ঠেলে দিয়ে হেসে বললে, যাঃ– রাজলক্ষীর চোখ দিয়ে হঠাৎ ঝর ঝর করে জল পড়ল। সে অশ্রুসিক্ত স্বরে বললে, তুমি ভালোবাসো বলেই বেচে আছি শরৎদি । তুমি গরীব হতে পারো, আমার কাছে তুমি গড়বাড়ির রাজার মেয়ে, এই দেউল, মন্দির, দীঘি, গড়, ঠাকুর-দেবতার মাত্তি সব তোমাদের, আমি তোমাদের প্রজার মেয়ে, একপাশে পড়ে থাকি--তুমি সনজরে দ্যাথো বলে বার বার আসি— শরৎ কৌতুকের সরে বললে, খেপলি নাকি, রাজি ? কী হয়েছে আজ তোর ? রাজলক্ষী চলে যাবার কিছু পরে বটুক এসে ডাকলে, ও শরৎ—বাড়ি আছ ? শরৎ তখন স্নান করতে যাবার জন্যে তৈরী হয়েছে,বটুককে দেখে একটু বিব্রত হয়ে পড়ল। মুখে বললে, এসো বটুকদা— —হ’্যা, এলাম । তুমি বুঝি— —নাইতে বেরিয়েছি বটুকদা। রাজির সঙ্গে বন থেকে মেটে আল তুলতে গিয়েছিলাম কি না । না ডুব দিয়ে ঘরে-দোরে ঢুকবো না— —ও, তা আমিঃনা হয় অন্য সময়— —কোনো কথা ছিল ?