পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩৮২ বিভূতি-রচনাবলী একবার ননী বাবাজীকেই বলে দেখি, যদি কিছু যোগাড়-টোগাড় করে দিতে পারে। ননীর অবস্হা পরিবত্ত'নে গ্রামের কেউই অসুখী নয়, বরং সকলেই আনন্দিত। কারণ ননীর সঙ্গে এ গ্রামের কারো বাথের সংঘাত নেই, ননী এখানে বাসও করে না—তাছাড়া সবাই ননীকে শেষবার যখন দেখেচে তখন ননী ছিল ছোট ছেলে—তার সম্পকে কোনো হিংসাদ্বন্দ্বের মতি কারো মনে গড়ে ওঠে নি—ছোট ছেলের ওপর স্নেহের মতি ছাড়া । বিকেলে বাঁধানো বটতলায় প্রকান্ড মজলিস বসেচে–মাঝখানে গাছের গড়ি ঠেস দিয়ে বসে ননী—তাকে গোলাকারে ঘিরে গায়ের বালক, বন্ধ ও যাবার দল। কি ক’রে সে বড়লোক হোল, এ কথা সবাই শুনতে চায়। শ্ৰীপতি কম’কার ওপাড়ার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ৷ তামাকের ব্যবসা করে তিনি হাতে দ’পয়সা জমিয়েচেন সবাই বলে, যদিও শ্ৰীপতি তা স্বীকার করেন না । শ্ৰীপতির সঙ্গে ননীর বাবা রাজেন বড়িয্যের খুব বন্ধত্ব ছিল, ননীর আসবার খবর পেয়ে তিনি পায়ের বাত সত্ত্বেও ওপাড়া থেকে এসেচেন দেখা করতে । শ্রীপতি জিগ্যেস করলেন—তা বাবাজির এখন থাকা হয় কি কলকাতাতেই ? —আজ্ঞে না, আমি, থাকি হোসঙ্গাবাদ, ন-ম’দার ধারে, সি. পি.—সেখানেই আমার কাঠের গেলো আর আপিস । কলকাতাতে এসেছিলাম—একটু কাজও ছিল, আর একখানা মোটর কিনবো বলে । কাল তাই ভাবলাম গাড়িখানা তো কেনা হোল, একবার এতে করে গিয়ে পৈতৃক ভিটেটা দেখে আসি । বলা বাহুল্য ননী কোথায় থাকে সে কথা কেউ বুঝতে পারলেন না, ন'ম'দা নামে একটা নদীর কথা অনেকে কাশীরাম দাসের মহাভারতের মধ্যে পড়েচেন—কিস্ত তার ভৌগোলিক অবস্হান সম্বন্ধে এদের ধারণা—কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের প্রভাতে সমুদ্রবক্ষ থেকে দশ্যমান দরের তীররেখার চেয়ে স্পষ্টতর নয় । পঞ্চু মািখয্যে একটা সোজা প্রশ্ন জিগ্যেস করলেন— বিয়ে করেচ কোথায় বাবাজী ? —ওই হোসঙ্গাবাদেই, আমার বশরে ওখানকার ডাক্তার ৷ বহদিন সেখানে বাস করচেন, তবে কলকাতায় সব আত্মীয়স্বজন আছে তাঁদের । দেখতে দেখতে দু'দিন কেটে গেল ৷ একবেলা থাকবার জন্যে ননী এসেছিল এখানে... কিন্ত শৈশবের শত মতি-মাখানো গ্রামকে হঠাৎ ছেড়ে যেতে তার সাধ্যে কুলিয়ে উঠল না । ননীর এক ছোট ভাই ছিল বোবা ও কালা, তিন বছর বয়সে বষণার সময় ননীদের বাড়ির পেছনে ডোবার জলে ডুবে মারা গিয়েছিল ; মৃতদেহ যখন ভেসে উঠেছিল তখন জানা যায়, তার আগে হারিয়ে গিয়েচে বলে এপাড়া-ওপাড়া খোঁজ হুচ্ছিল । সেই ডোবাটি তেমনি আছে। এ-সব পাড়াগাঁয়ে কোনো কিছু হঠাৎ বদলায় না, হয়তো আরও বিশ বছর ডোবাটা থাকবে, হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর থাকবে । ননীর বয়েস তখন ছ'বছর, কিন্ত সে বধ'দিনের কথা আজও তার বেশ মনে আছে—কখনও কি ভুলবে ? ওপারের ওই ডুমর গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ননীর বাবা, এপারে লোকে লোকারণ্য হয়েছিল। হোসঙ্গাবাদে তার কিসের বাঁধন আছে ? কিছুই না— সে দু'দিনের বাঁধন । এখানকার সঙ্গে সম্মবন্ধ অনেক গভীর ; এতদিন আসে নি, তাই ভুলে ছিল । আজ সেই তিন বছরের অবোধ বোবা কালা ছোট ভাইয়ের করণ মুখখানি তার মনে স্পষ্ট হয়ে ফুটলো—সে কি ভাবে তার দিকে চাইতো, তার সে বধিহীন দটি, নাকের সেই তিলটি-আশ্চষ" । মানুষের এতও মনে থাকে ! সমস্ত জীবনটা ননী যেন এক মহমত্তে একটা ম্যাপের মত চোখের সামনে পড়ে আছে দেখতে পেলে । প্রথম জীবনের দারিদ্র্য, প্রথম বিদেশযাত্রা, ব্যবসাতে উন্নতি, বিবাহ-তার