পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৪২৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


SRS বিভূতি-রচনাবলী মাসের মধ্যে এসে বাস করবে। পট্টনায়েক যে বাংলো দেবে বলেছিল, সেটা দেখলাম। বড় বড় গাছের মধ্যে বাংলোটা, বারান্দায় বসে সিদ্ধেশ্বর ডুংরির দশ্য উপভোগ করা যায় । নিকটেই নীলঝরনা, জলের কন্ট হবে না । কবিরাজ নেই, ডাক্তারও নেই ওদের বাংলোতে । কবিরাজ গিয়েচে টাটানগর; ডাক্তার গিয়েছে মহলিয়া, কাজেই বিজয়ার সম্ভাষণ এদের আর জানানো গেল না। ফিরবার পথে আমি গররা নদীর ধারের পলের ওপর বসে রইলাম অনেকক্ষণ । দরে কালাঝোর জ্যোৎস্না রাত্রে অঞ্চপল্ট দেখাচ্চে। পাহাড়ী নদীর কুলকুল শব্দ যেন সঙ্গীতের মধর শোনাচ্চে। তামা পাহাড়ের মাথার ওপর দু-একটা তারা মনকে নিয়ে যায় অনেক দর, কতদার, পথিবী পার করিয়ে অসীম দ্যতিলোকের মধ্যে । একটু পরে পট্টনায়েক এল পলের ওপরকার কাঠ ধরে । আমি বসে আছি দেখে বললে, চলন আমার বাসায় । একটু বিজয়ার মিটিমুখ করবেন। আমি বললাম—হেটে ক্লান্ত আছি, আজ আর নয় । তারপর সে অনেকক্ষণ বসে নানা গলপ করলে । রাত নটার সময় বাড়ি ফিরি। পশুপতিবাব আজ আসবেন কথা ছিল, এলেন না, সেজন্যে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আমি আর নীরদবাব বেরলাম সন্ধ্যায় ঠিক সময়ে । যাওয়ার পথে অপরাহের ঘন ছায়া নেমে এসেছে পাহাড়ের অধিত্যকায়, তার কোলে-কোলে এদিকে ওদিকে চারিদিকে সাদা সাদা বকের দল উড়চে । সমস্ত দিনের অবসাদ একমহেনত্তে কেটে গেলে যেন, সেদিকের অপরপে সন্ধ্যার পানে চাইলাম। ওখান থেকে এসে নীলঝরনার দিকে চলি । তামা পাহাড়ের ওপর উঠলমে পিয়ালতলা দিয়ে । বড় বট গাছটাতে একরাশ জোনাকী জলচে, ওধারে উঠেচে প্রয়োদশীর চাঁদ, তামা পাহাড়ের বিরাট অধিত্যকার গায়ে পর্ব থেকে পশ্চিমে দীঘ" বড় বড় ছায়া পড়েচে । আমরা দ-ধারে পাহাড়ের গিরিপথটা পার হয়ে নামলম ওপারের জ্যোৎস্নাশভ্ৰ উপত্যকায় । বনতুলসীর জঙ্গল আর তার মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শাল ও তমাল। চারিধারেরপ যেন থৈ থৈ করচে । পাহাড়ের মাথায় এদিকে ওদিকে দু-চারটি নক্ষত্র । নীলঝরনার জল পার হয়ে বরমডেরার পথে একজন পাহাড়ী লোকের সঙ্গে দেখা । সে একা একটা লাঠি হাতে গান গাইতে গাইতে চলেচে কুলামাতোর দিকে। তাকে বললাম—অত জঙ্গলে এত রাত্রে একা যাবি, যদি বাঘের হাতে পড়িস । সে বললে—খেদিয়ে দিব বাব । অর্থাৎ সে লাঠি দিয়ে বাঘ তাড়িয়ে দেবে। আমরা আর একটু এগিয়ে যেতেই চারিধারের পাহাড়ী অধিত্যকার নিজানতায় জ্যোৎস্না-ধোঁত সৌন্দয্যে যেন কেমন হয়ে গিয়েচি। একটা ভারি আশ্চৰ্য্য জিনিস দেখা গেল । দরে ধঞ্জরী শৈলমালার গায়ে একটা নক্ষত্র জলছিল, খানিকক্ষণ থেকে সেটা আমরা দেখচি। আর আমি মাঝে মাঝে দেখচি ডাইনের রথোম পাহাড়ের দিকে, বাংলা দেশের আলো ছায়া ভরা কোজাগরী পণিমা রাত্রের কথা ভাবচি, এমন সময় নক্ষত্রটা যেন টুপ করে খসে গেল পাহাড়ের ঢাল থেকে। আর সেটা দেখা গেল না। আমরা দু-জনেই অবাক হয়ে রইলাম । সবুজ ঝরনার কাছে এসে বসলম, ওখানে একটি সবাহৎ শিমল গাছের শাখা নত হয়ে আছে । ঝরনার জলের ওপর কুলকুল ক্ষীণ শব্দ হচ্চে ঝরনার জলধারার, জ্যোৎস্না রায়ে ঝরনার জল চিকচিক করচে, বড় শিমল গাছের মাথায় একরাশ জোনাকী জলচে, সে এক অপরপ ছবি। ছবিটা বহুদিন মনে থাকবে । তারপর রথোমের পাহাড়ের একেবারে মাথায় একটা বড় শিলাখণ্ডের ওপরে উঠে বসি । যেদিকে চাই, জ্যোৎস্নাবিধৌত বনরাজি