পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৭৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সপ্তদশ পরিচ্ছেদ পরদিন বৈকালে গয়ায় নামিয়া সে বিষ্ণুপাদমন্দিরে পিণ্ড দিল । ভাবিল, আমি এসব মানি বা না মানি, কিন্তু সবটুকু তো জানি নে ? যদি কিছু থাকে, বাপমায়ের উপকারে লাগে ! পিণ্ড দিবার সময়ে ভাবিয়া ভাবিয়া ছেলেবেলায় বা পরে যে যেখানে মারা গিয়াছে বলিয়া জানা ছিল, তাহাদের সকলেরই উদ্দেশে পিণ্ড দিল । এমন কি, পিসিমা ইন্দির ঠাকরণকে সে মনে করিতে না পারিলেও দিদির মুখে শনিয়াছে,—তাঁর উদ্দেশে —আতুরী ডাইনী বড়ীর উদ্দেশেও । বৈকালে বন্ধগয়া দেখিতে গেল। অপর যদি কাহারও উপর শ্রদ্ধা থাকে তবে তাহার আবাল্য শ্রদ্ধা এই সত্যদুষ্টা মহাসন্ন্যাসীর উপর । ছেলের নাম তাই সে রাখিয়াছে অমিতাভ । বামে ক্ষীণস্রোতা ফগে কটা রঙের বালশয্যায় ক্লাস্ত দেহ এলাইয়া দিয়াছে, ওপারে হাজারিবাগ জেলার সীমাস্তবত্তী পাহাড়শ্রেণী, সারাপথে ভারী সন্দের ছায়া, গাছপালা, পাখির ডাক, ঠিক যেন বাংলাদেশ । সোজা বাঁধানো রাস্তাটি ফগের ধারে ধারে ডালপালার ছায়ায় ছায়ায় চলিয়াছে, সারাপথ অপর অবপ্লাভিভুতের মত একার উপর বসিয়া রহিল । একজন হালফ্যাশানের কাপড়-পরা তরণী মহিলা ও সম্ভবত তাঁহার স্বামী মোটরে বন্ধেগয়া হইতে ফিরিতেছেন, আপন ভাবিল হাজার হাজার বছর পরেও এ কোন নতেন যুগের ছেলেমেয়ে— প্রাচীনকালের সেই পীঠস্থানটি এমন সাগহে দেখিতে আসিয়াছিল ? মনে পড়ে সেই অপবে* রাত্রি, নবজাত শিশুর চাদমুখ ছন্দক.গয়ার জঙ্গলে দিনের পর দিন সে কি কঠোর তপস্যা । কিন্তু এ মোটর গাড়ি ? শতাব্দীর ঘন অরণ্য পার হইয়া এমন একদিন নামিয়াছে পৃথিবীতে, পুরাতনের সবই চণ করিয়া,উন্টাইয়া-পাটাইয়ানবযুগের পত্তন করিয়াছে। রাজা শধোধনের কপিলাবস্তুও মহাকালের স্রোতের মুখে ফেনার ফুলের মত কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে, কোন চিহ্নও রাখিয়া যায় নাই—কিন্তু তাঁহার দিগ্বিজয়ী পত্র দিকে দিকে যে বহত্তর কপিলাবস্তুর অদশ্য সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছেন--তাহার প্রভুত্বের নিকট এই আড়াই হাজার বৎসর পরেও কে না মাথা নত করিবে ? গয়া হইতে পরদিন সে দিল্লী এক্সপ্রেসে চাপিল—একেবারে দিল্লীর টিকিট কাটিয়া । পাশের বেশ্চিতেই একজন বাঙালী ভদ্রলোক ও তাঁহার শত্রী যাইতেছিলেন ! কথায় কথায় ভদ্রলোকটির সঙ্গে আলাপ হইয়া গেল । গাড়িতে আর কোন বাঙালী নাই, কথাবাত্ত"ার সঙ্গী পাইয়া তিনি খাব খুশী । অপর কিন্তু বেশী কথাবাত্তা ভাল লাগিতেছিল না। এরা এসময় এত বক-বক করে কেন ? মারোয়াড়ী দলটি তো সাসারাম হইতে নিজেদের মধ্যে বকুনি শর করিয়াছে, মুখের আর বিরাম নাই । খুশীভরা, উৎসক, ব্যগ্র মনে সে প্রত্যেক পাথরের নড়িটি, গাছপালাটি লক্ষ্য করিয়া চলিয়াছিল। বামদিকের পাহাড়শ্রেণীর পিছনে সযেf্য অস্ত গেল, সারা পশ্চিম আকাশটা লাল হইয়া আছে, আনন্দের আবেগে সে দ্রতগামী গাড়ির দরজা খালিয়া দরজার হাতল ধরিয়া দাঁড়াইতেই ভদ্রলোকটি বলিয়া উঠিলেন, উ*হন, পড়ে যাবেন, পাদানিতে লিপ করলেই—বন্ধ করনে মশাই । {r অপর হাসিয়া বলিল, বেশ লাগে কিন্তু, মনে হয় যেন উড়ে যাচ্ছি। গাছপালা, খাল, নদী, পাহাড়, কাঁকর-ভরা জমি, গোটা শাহাবাদ জেলাটা তাহার পায়ের তলা দিয়া পলাইতেছে। অনেক দর পয্যন্ত শোণ নদের বালর চড়া জ্যোৎস্নায় অদ্ভুত দেখাইতেছে । নীল নদ । ঠিক এটা যেন নীল নদ । ওপারে সাত-আট মাইল গাধার পিঠে চড়িয়া গেলে ফারাও রামেসিসের তৈরী আবসিবেলের বিরাট পাষাণ মন্দির—ধসের অপটি