পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/১৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অপরাজিত > R。 বিছানার উপর সর্বজয়া যেন ঘুমাইতেছেন। তেলি-বেী একবার ভবিল-ডাকিবে না— কিন্তু পথ্যের কথা জিজ্ঞাসা করিবার জন্য ডাকিয়া উঠাইতে গেল। সর্বজয়া কোনও সাড়া দিল না, নড়িলও না। বড়-বেী আরও দু-একবার ডা ডাকি করিল, পরে হঠাৎ কি ভাবিয়া নিকটে আসিয়া ভাল করিয়া দেখিল । পরক্ষণেই সে সব বুঝিল । সর্বজয়ীর মৃত্যুর পর কিছুকাল অপু এক অদ্ভুত মনোভাবের সহিত পরিচিত হইল। প্রথম অংশটা আনন-মিশ্রিত—এমন কি মায়ের মৃত্যু-সংবাদ প্রথম যখন সে তেলি-বাডির তারের খবরে জানিল, তখন প্রথমটা তাহার মনে একটা আনন্দ, একটা যেন মুক্তির নিঃশ্বাস , একট। বাধন-ছেড়ার উল্লাস-অতি অল্পক্ষণের জন্য—নিজের অজ্ঞাতসারে । তাহার পরই নিজের মনোভাবে তাহার দুঃখ ও আতঙ্ক উপস্থিত হইল। এ কি ! সে চায় কি ! মা যে নিজেকে একেবারে বিলোপ করিয়া ফেলিয়াছিল তাহার সুবিধার জন্ত । মা কি তাহীর জীবনপথের বাধা ?—কেমন করিয়া সে এমন নিষ্ঠুর, এমন হৃদয়হীন—তবুও সত্যকে সে অস্বীকার করিতে পারিল না। মাকে এত ভালবাসিত তে, কিন্তু মায়ের মৃত্যু-সংবাদটা প্রথমে যে একট। উল্লাসের স্পর্শ মনে আনিয়াছিল—ইহা সত্য—সতা—তাহীকে উড়াইয়া দিবার উপায় নাই । তাহার পর সে বাড়ি রওনা হইল। উলা স্টেশনে নামিয়া ইটিতে শুরু করিল। এই প্রথম এ পথে সে যাইতেছে—যেদিন মা নাই! গ্রামে ঢুকবার কিছু আগে আধমজ কোদলা নদী, এ সময়ে হঁটিয়া পার হওয়া যায়—এরই তীরে কাল মাকে সবাই দাহ করিয়া গিয়াছে! বাড়ি পৌছিল বৈকালে। এই সেদিন বাড়ি হইতে গিয়াছে, মা তখনও ছিল ‘ঘরে তালা দেওয়া, চাবি কাহাদের কাছে ? বোধ হয় ভেলি-বাড়ি ওরা লইয়া গিয়াছে। ঘরের পৈঠায় অপু চুপ করিয়া বসিয়া রহিল । উঠানের বাহিরে আগড়ের কাছে এক জায়গায় পোড়া খড় জড়ো করা। সেদিকে চোখ পড়িতেই অপু শিহরিয়া উঠিল—সে বুঝিয়াছে—মাকে যাহারা সৎকার করিতে গিয়াছিল, দাহ অন্তে তাহার কাল এখানে আগুন ছুইয়া নিমপাত খাইরা শুদ্ধ হইয়াছে—প্রথাটা অপু জানে..মা মারা গিয়াছে এখনও অপুর বিশ্বাল হয় নাই ‘একুশ বৎসরের বন্ধন, মন এক মুহূর্তে টানিয়া ছিড়িয়া ফেলিতে পারে নাই। কিন্তু পোড়া খড়গুলাতে নয়, রূঢ়, নিষ্ঠুর সত্যটা-মা নাই! মা নাই! বৈকালের কি রূপট ! নির্জন, নিরালা, কোনও দিকে কেহ নাই। উদাস পৃথিবী, নিস্তব্ধ বিবাগী রাঙা-রোদভরা আকাশটা ৷ . অপু অর্থহীন দৃষ্টিতে পোড়া খড়গুলার দিকে চাহিয়ু রহিল ... কিন্তু মায়ের গায়ের কঁথাখানা উঠানের আলনায় মেলিয়া দেওয়া কেন ? কুঁথি থান। মায়ের গায়ে ছিল...সঙ্গেই তো যাওয়ার কথা। অনেক দিনের কথা, নিশ্চিন্দিপুরের আমলের, মায়ের হাতে সেলাই করা, কন্ধা-কাট রাঙা স্থতার কাজ কতক্ষণ সে বসিয়া ছিল জানে না, রোদ প্রায় পড়িয়া আসিল। ভেলি-বাড়ির বড় ছেলে নাছর ডাকে চমক ভাঙিতেই সে বি. র ২–৯