পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/২৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


९२b' বিভূতি-রচনাবলী জ্যোংস্কারাত্রে আমার কাছে কাছেই আছে। মানসারে যেখানে নাগপুর-জব্বলপুর রোড থেকে রামটেকের পথটা বেঁকে এল—সেখানে একটা P.W.D. বাংলো আছে, সামনে একটা পদ্মফুলে ভরা জলাশয় । স্থানটি অতি মনোরম। দুপুরে আজ এই ম্যাঙ্গানিজগুলি আমরা দেখে গিয়েছিলাম—বিরাট পর্বতের ওপর মোটর গাড়ী উঠিয়ে নিয়ে গেল—অনাবৃতদেহ পর্বতপঞ্জর রৌদ্রে চকচক করচে, খাড়া কেটে ধাতুপ্রস্তর বার করে দিয়েচে—সামনে ৪০hist ও granito-নীচের স্তরগুলোতে কালো ম্যাঙ্গানিজ । একজন ওদেশী কেরানী আমাদের সব দেখালে, সঙ্গে দু টুকরো ম্যাঙ্গানিজ দিলে কাগজ-চাপ করবার জন্তে। তারই মুখে শুনলাম এই ম্যাঙ্গানিজ স্তর এখান থেকে ২৫/২৬ মাইল দূরে ভাগুরা পর্যন্ত চলে গিয়েছে—মাঝে মাঝে সমতল জমি, আবার পাহাড় ঠেলে ঠেলে উঠেচে। নাগপুর-জব্বলপুর রোডে অনেক পাহাড় পড়ে জব্বলপুরে যেতে। সিউনির দিকেও পাহাড় ও জঙ্গল মন্দ নয়। কিন্তু সর্বাপেক্ষ সুন্দর দৃপ্ত নাগপুরঅমরাবতী রোডে। নাগপুর শহর থেকে ২৫ মাইল দূরবর্তী বাজারগাও গ্রাম থেকে কানহোলি ও বোরি নদীর উপত্যকাভূমি ধরে যদি বরাবর সোজা উত্তর-পশ্চিম দিকে যাওয়া যায়, তা হলে শৈলমাল, মালভূমি ও অরণ্যে-ঘেরা এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্বের সম্মুখীন হতে হবে। মানসার ছেড়ে আমরা নাগপুর-জব্বলপুর রোডে পড়লাম। দুধারে দূরপ্রসার সমতলভূমি জ্যোৎস্নায় ধুধু করচে—আকাশে দু-দশটা নক্ষত্র-দূরে নিকটে বুক্ষশ্রেণী। এখনও নাগপুর ২৫ মাইল । সারাদিন পাহাড়ে ওঠানামা পরিশ্রমের পর, হু-হু ঠাণ্ড বাতাস বেশ আরামপ্রদ বলে মনে হচ্চে। ক্রমে কামটি এসে পড়লাম। পথে কানহান নদীর সেতুর উপর এসে মোটরের এঞ্জিন কি বিগড়ে গেল। আমরা জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদীবক্ষের দিকে চেয়ে আর একট। সিগারেট ধরলাম। পেছনে রামটেক্ প্যাসেঞ্জার ট্রেনথান কানহান স্টেশনে দাড়িয়ে আছে—আমার ইচ্ছে ছিল ট্রেনে মোটরে একট। রেস হয়—কিন্তু ত আর হল না, ট্রেন ছাড়বার আগেই মোটরের এঞ্জিন ঠিক হয়ে গেল। কামটিতে এঞ্জিন আবার বিগড়ালে৷ একবার, কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঠিক হল । তারপর আমরা নাগপুর এসে পড়লাম—দূর থেকে ইন্দোরের আলো দেখা যাচে । কিন্তু কিনদা হ্রদের তীরের গিরিসপুর জঙ্গল আমি এখনও ভুলি নি। শরতের নীল আকাশের তলায় সেই নিবিড় ছায়ানিকেতন আরণা প্রদেশটি আমার মনে একটা ছাপ দিয়ে গেছে । আহা ! ঐ বনের শিউলি গাছগুলোতে যদি ফুল ফুটত, আরও যদি দু-চার ধরনের বনফুল দেখতে পেতুম—তবে আনন্দ আরো নিবিড় হত—কিন্তু এমনি কত দেখেচি, তার তুলনা নেই। বুনো বাশের ছোট ছোট ঝাড়গুলির কি গুণমল শোভা ! পূজোর ছুটি ফুরিয়ে যাবে, আবার কলকাতার লোকারণের মধ্যে • ফিরে যাব, আবার দশটা পাচটা স্কুলে ছুটব, আবার অপকৃষ্ট ‘ক্যালকাটা কেবিনে বসে চা ও ডিমের মামলেট খাব—তখন এই বিশাল পার্বত্যকায় সরোবর, এই শরতের রৌদ্র-ছায়াভর কটুতিক্ত গন্ধ ওঠা ঘন অরণ্যানী, এই জ্যোৎস্নাল্পবিত্ত নির্জন গিরিসায়—এই আম্বারা, কিন্‌লী, রামটেকের মন্দির-দুর্গ—এসব বস্থকাল আগে দেখা স্বপ্নের মত অস্পষ্ট হয়ে মনের কোণে উকি মারবে।