পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৩৯১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক ৩৬৫ তাকে বললুম, মশাল কি হবে ? —মশাল জালা দেখে অন্ত নোঁকে কি স্টীমার আমাদের পাবে। একটা বিপদ আছে বাবু, এই পথ দিয়ে বড় জাহাজ রেজুন কি মডু থেকে চাটগা যায়–কুয়াশার মধ্যে যদি ধাক্কা লাগে তবে তো সাম্পান ডুবে যাবে—আর একটা বিপদ বাৰু, মাঝে মাঝে বা আছে, সমুদ্রের মধ্যে, তাদের মাথায় আলো জলে—যদি কুয়াশার মধ্যে আলো টের না পাই তবে বয়ার গায়েও ধাক্কা লাগতে পারে— —ঠিক সেই কারণে তো আমাদের মশালও না দেখা যেতে পারে অন্ত নৌকো বা স্টীমার থেকে ? মাঝি সে কথার কোনো উত্তর দিলে না। আমি দেশলাই বার করে মাঝির হাতে দিতে যাবে, এমন সময় কি একটা শব্দে চমকিত হয়ে বলে উঠলুম–কিসের শব্দ মাঝি ? মাঝির গলার মুর ভয়ে বিকৃত হয়ে উঠেচে–সে বলে উঠলে, বাবু, সাম্পানের কাঠ অঁাকড়ে ধরুন জোর করে—সামনে পাহাড়— একমুহূর্তে বুঝে ফেললুম আমাদের সঙ্কটের গুরুত্ব। সামনে আদিনাথ পাহাড়, দিক ভুল করে মাঝি সাম্পান নিয়ে এসেচে উত্তর-পূর্ব দিকে—কিছুই চোখে দেখা যায় না, শুধু সাগরের ঢেউ পাহাড়ের গারে আছড়ানোর শবে বোঝা যায় যে পাহাড় নিকটবর্তী। কিন্তু আরও দশ মিনিট কেটে গেল। পাহাড়ের গায়ে ঢেউয়ের শব তখনও সামনের দিকে, কিন্তু সাম্পান যেন সে শব্দকে ছাড়িয়ে আরও উত্তরে চলে যাচ্ছে। ব্যাপার কি। মাঝিও কিছু বলতে পারে না ! হঠাৎ আমার মনে হল ঠিক সামনেই কাউখালি নদী সমুদ্রে পড়চে ; কুয়াশা তখনও খুব ঘন, এ সব কুয়াশা ক্রমে ক্রমে পাতলা হয় না, অতর্কিতে এক মুহূর্তে চলে যাবে। আমি মাঝিকে বললুম—মাঝি, নদীর মোহান সামনে— মাঝি বললে—বাবু, ও কাউখালি নয়, আদিনাথের ঝরনা, কুয়াশার মধ্যে ওই রকম দেখাচ্চে, আমরা উত্তর দিকে যাচ্চি ভেসে । এ জায়গাটা আরও ভয়ানক— মাঝি আমাকে যাই বলুক, ভয়ের চেয়ে একধরনের অদ্ভুত আনন্দই বেশি করে দেখা দিয়েছে মনে । সমুদ্রে দিকৃহারা হয়ে সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়বো এ তো বাল্যকালের স্বল্প ছিল ; নাই বা হল খুব বেশি দূর—মাত্র চট্টগ্রামের উপকূল—সমূদ্র, সব জায়গাতেই সমুদ্র, মাথার ওপরকার আকাশ সব জায়গাতেই নীল, কল্পনা সর্বত্রই মনে আনে নেশার ঘোর। কিন্তু আমার অদৃষ্টে বেশি ঘটলে না। আদিনাথের নীচে কয়েকখানা জেলেডিঙি বাধ, আমাদের সাম্পানের আলো দেখতে পেয়েছিল। তাদের লোক মাৰিকে ডাক দিয়ে কি বললে, সেখানে অতি সহজেই আমাদের নৌকো ভিড়লো। আরও আধঘণ্টা পরে কুয়াশা কেটে গেল। সেই জ্যোৎস্নালোকিত সমুদ্রবক্ষে সাম্পান ছেড়ে আমরা এসে পৌছলুম কাউখালি মোহানায়। দূরের সমুদ্র স্থির নিস্তরঙ্গ, তটভূমির