পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪২৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


n 8е е বিভূতি-রচনাবলী যখন খেতে বসেচি তিনি একটু দূরে বলে আমার যত্ন করে খাওয়ালেন। হেসে বললেন —আপনি যে বললেন রণধতে জানেন ? —একটু একটু জানি, সামান্ত। মানে খুব ভালোরকম নয়। —কিছুই জানেন না আপনি রান্নার। আমি চুপ করে রইলাম। বিছে যেখানে ধরা পড়ে গিয়েচে সেখানে কথা বলা সঙ্গ নয়। দুদিন আমি তাদের বাড়ি ছিলাম । ভদ্রমহিলা চারবেলা কেবল আমার রান্নার জায়গায় দাড়িয়ে যে আমায় রান্না দেখিয়ে দিতেন তাই নয়, তিনি শুধু ছাড়িটা ছুতেন না, বাকি কাজ সব নিজের হাড়েই করতেন, তরকারিতে মশলা মাখানো, তরকারি হাড়িতে ছেড়ে দেওয়া-- সব t তিনি গৃহস্বামীর বিধবা কন্যা,যেমন শান্ত তেমনি স্নেহময়ী ও কর্তব্য-পরায়ণা। আমি তাকে দিদি বলে ডেকেছিলুম। তিনিও আমার ওপর ছোট ভাইয়ের মত ব্যবহার করেছিলেন ঘেছুদিন তাদের ওখানে ছিলাম। আমার ভ্রমণপথে আর একটি মহিলার সাক্ষাৎ পেয়েছিলুম। সেকথা যথাস্থানে বলবো । ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নোয়াখালি রওনা হই দুপুরের ট্রেনে । এখানে এসে স্থানীয় জনৈক উকিলবাবুর বাড়িতে উঠি । এক একটা জায়গা আছে যা মনের মধ্যে অবসাদ ও অস্বস্তির স্বষ্টি করে, নোয়াখালি সেই ধরনের শহর । হয়তো এখানে একটি দিন মাত্র থেকেই চলে যেতাম কিন্তু যে ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলাম তিনি আমায় যেতে দিলেন না। তার আতিথেয়তার কথা আমার চিরদিন স্মরণে থাকবে। ভদ্রলোক নোয়াখালি ‘বার’এর একজন বড় উকিল, তার বাড়ি যেন একটি হোটেলখানা। বাক্টরের দিকে এক সারি টিনের ঘরে কয়েকটি দরিদ্র স্কুলের ছাত্র থাকে, ভদ্রলোক তাদের শুধু যে খেতে দেন তা নয়, ওদের সমুদয় খরচ নির্বাহ করেন । এ ছাড়া আহুত ও অনাহূত কত লোক যে তার বাড়ি দুবেলা পাতা পাতে তার কোনো হিসেব নেই। এই ভদ্রলোকের নাম আমি এখানে উল্লেখ করলুম না, তার কোন প্রয়োজন নেই। আশা করি তিনি আজও বেঁচে আছেন এবং ভগবানের কৃপায় দীনদরিদ্রের উপকার সমান ভাবেই করে যাচেন । আমার চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি, কিন্তু আমার সঙ্গে তিনি মিশতেন ঠিক যেন সমবয়সী বন্ধুর মতো। সকালে উঠে আমায় ঘরে এসে বসে কত গল্প করতেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ভালো ছিল না তার বাড়ি, অত লোককে খেতে দিতে গেলে রাজভোগ দেওয়া চলে না গৃহস্থের বাড়ি। কিন্তু ভদ্রলোকও আমাদের সঙ্গে বসে সেই মোট চালের ভাত, ডাল আর হয়তো একটা চচ্চড়ি কি ভাজা দিরে খেয়ে উঠতেন! তিনি গৃহস্বামী, এত টাকা উপার্জন করেন, নিজের পৃথক ভোগের আয়োজন ছিল না তার। দেশ বেড়িয়ে যদি মানুষ না দেখলুম, তবে কি দেখতে বেরিয়েচি ?