পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কত গভীরে পরিবাথ, তা ভাবতে গিয়ে মন বিস্ময়ে আনন্দে ভরে উঠেছিল। এইখানে বিভূতিবাবু শিল্পীরূপে এক অজানা উচ্চতায় উঠে গেছেন। যদু মুখুজ্জের মরণকালের ঐ একটুখানি আত্মচিস্তার মধ্যে বিভূতিবাবুকে যদি কেউ আবিষ্কার করতে ন পারেন তবে তিনি বিভূতিবাবুকে সম্পূর্ণরূপে পেলেন না। ছোটগল্পেও বিভূতিবাবুর অসামান্ত কৃতিত্ব। তার অনেক ছোট গল্প যথার্থ ছোট গল্প, আবার অনেকগুলি শুধুই গল্প। তা ছোট গল্প হওয়ার আগেই তিনি থামিয়ে দিয়েছেন, ছোটগল্পের পরিচিত চেহারাও সে সব গল্পে পরিকল্পিত হয়নি, গল্প বলতে বলতে যেখানে গিয়ে থামে । গল্পের আয়োজন, নতুন কোনো চেহারায় ফুটে উঠল কিনা, সে দিকে খেয়াল নেই। অর্থাৎ vignette-এর মাত্রাট একটু বেশি। এই গল্পগুলি প্রমথ চৌধুরীর অনেক গল্পকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পড়তে ভাল লাগে এটাই এদের পরিচয় । বাকি আর সব ছোট গল্প, এবং তৃপ্তিদায়ক ছোটগল্প । ছোটর মধ্যে মহত্ত্ব I. এক যুগে চমকপ্রদ ছিল। বিভূতিবাবুর কয়েকটি গল্পে এই পরিকল্পনাটা আছে, কিন্তু তার মনেকগুলি ভঙ্গিসর্বস্ব হওয়াতে dated হয়ে গেছে। যেগুলি হয়নি, তা চমকপ্রদ ; আজও, এবং পরেও চমকপ্রদই থাকবে। আমি নবাগত ও অসাধারণ এই দুখানা বই থেকে দুটি গল্প বিভূতিবাবুকে ব্যাখ্যা করার জন্য বেছে নিচ্ছি। এর সঙ্গে "হে অরণ্য কথা কও', এবং 'অসাধারণ বইয়ের একটি রচনা— ‘মাকাল-লতার কাহিনী’ । গল্প দুটি হচ্ছে দ্রবময়ীর কাশীবাস ও পিদিমের নিচে । আমার মনে হয় এই দুটি গল্পের ভিতর দিয়ে বিভূতিবাবুর একটি ধর্মমতও পাওয়া যাবে। এ ধর্ম আনুষ্ঠানিক কোনো আচার পালনের ধর্ম নয়। শিল্পী তার শিল্প সাধনার ভিতর দিয়ে জীবনের একটা সত্যে এসে পৌছন, তা তার নিজস্ব উপলব্ধি । প্রত্যেক বড় শিল্পীরই এই উপলব্ধি ঘটে বা ঘটা সম্ভব । আচার পালনের জটিলতার মধ্যে জীবনের প্রাপ্তি কিছুই নেই, দ্রবময়ী গল্পের ভিতর আছে এই ইঙ্গিতটি । এটি সজ্ঞান কোনো প্রচার বা ইঙ্গিত নয় । একটি বাস্তব ছবির ভিতরে এটি আপন থেকেই ফুটে উঠেছে। ছোট গল্পের ভিতর কোনো প্রচার-প্রচেষ্টা থাকলে শিল্পরূপে তা সার্থক হয় না। বিভূতিবাবু নিজে যা পেয়েছেন, তা দ্রবময়ীর মধ্যে দেখেছেন, এই মাত্র বলা যায়। আর পিদিমের নিচে গল্পে পাগলা ঠাকুরের মধ্যে দেখেছেন সেই সরল সত্যের প্রকাশ।" তাই তিনি তার অজ্ঞাতসারেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। গল্প দুটি আমি বিশ্লেষণ করব না, পাঠককে বলি পড়তে এবং অনুভব করতে। দ্রবময়ী ও পাগলা ঠাকুর সরল বিশ্বাসের ভিতর দিয়ে সত্যে উত্তীর্ণ। বিভূতিবাবু শিল্পীরূপেও ঠিক এই পথেই পেয়েছেন উীর ঈশ্বরকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিবেশে অভিভূত হয়ে তিনি বার বার একথা স্বীকার করেছেন। o ‘অসাধারণ বইয়ের মাকাল-লতার কাহিনী গল্প নয়। দার্শনিকতা ও কাব্যময়ত মিলিয়ে এ কাহিনীটি প্রকৃতি-পূজার একটি মনোভাব মাত্র। এ বইতে এ রচনা একটি প্রক্ষিপ অধ্যায় মনে হয়। সম্ভবত যা কিছু অসাধারণ মনে হয়েছে, তারই স্থান অসাধারণ বইতে দেওয়া হয়েছে, যদিও আমার মতে সব অসাধারণ নয়।