বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪২৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (সেনবংশ)
[৪২২]
বঙ্গদেশ (সেনবংশ)

একখানি প্রাচীন হস্তলিখিত সংস্কৃত গ্রন্থে আছে, মহারাজ বিজয়সেন অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গের অধীশ্বর হইয়া কুরঙ্গেষ্টির আয়োজন করেন, এই সময়েও কান্যকুব্জ হইতে যজ্ঞে ব্রতী হইবার জন্য পঞ্চ বৈদিক বিপ্রের শুভাগমন হইয়াছিল। দ্বিজ বাচস্পতির “বঙ্গজ কুলজীসারসংগ্রহে”ও লিখিত আছে—

“নয়শ চৌরানই শক পরিমাণে।
আইলেন দ্বিজগণ রাজ সন্নিধানে॥
পঞ্চ কায়স্থ সঙ্গে আরোহণ গোযানে।
সম্মান করিয়া ভূপ রাখিলা সর্ব্বজনে॥”

 উক্ত কুলগ্রন্থের প্রমাণে ৯৯৪ শকে কনোজ হইতে বৈদিক বিপ্রাগমন এবং সেই সঙ্গে দক্ষিণরাঢ়ীয় ও বঙ্গজ কায়স্থ-প্রধানদিগের বীজপুরুষগণের গৌড়াগমন সিদ্ধ হইতেছে। পঞ্চ বৈদিক বিপ্র বিনা কারণে গৌড়-রাজসভায় আসেন নাই। বল্লালোদয়ের কথা মানিলে বলিতে হয়, কুরঙ্গেষ্টি সম্পন্ন করিবার জন্য বৈদিক বিপ্রগণ আহূত হইয়াছিলেন। এরূপ স্থলে ৯৯৪ শকে বিজয়সেনের রাজ্যে অভিষেক ও কুরঙ্গেষ্টি যজ্ঞ এবং ঐ সময়ে বিজয় কর্ত্তৃক তৎপুত্র শ্যামলবর্ম্মার যৌবরাজ্যে অভিষেকক্রিয়া সুসম্পন্ন হইয়া থাকিবে।

বারেন্দ্র কায়স্থগণের “ঢাকুর” নামক কুলগ্রন্থেও লিখিত আছে—

“যাঁহার বংশের লোকে বল্লাল মর্য্যাদা।
নয়শ চৌরানই শকে না ছিল একদা॥”

 অর্থাৎ ৯৯৪ শকে যে সকল কায়স্থ আগমন করেন, সে সময়ে তাঁহাদের মধ্যে বল্লালমর্য্যাদা ছিল না।

 নানা কুলগ্রন্থে ৯৯৪ শক দৃষ্টে মনে হয় যে, ঐ অব্দ বঙ্গীয় ইতিহাসে বিশেষ স্মরণীয়। ঐ বর্ষে বিজয়সেনের অধিরাজপদে অভিষেক, কুরঙ্গেষ্টি যজ্ঞোপলক্ষে বৈদিক বিপ্র ও পঞ্চ কায়স্থের আগমন এবং বিক্রমপুরের শ্যামলবর্ম্মার যৌবরাজ্যে অভিষেক প্রভৃতি স্মরণীয় ঘটনা ঘটিয়াছিল।

 বিজয়সেন বারেন্দ্রের দক্ষিণাংশ জয় করিলেও উত্তরাংশ তখনও বৌদ্ধ-পালরাজাদিগের অধিকারে ছিল। দীর্ঘকাল বৌদ্ধাধিকারে থাকায় বারেন্দ্রের সকল লোকই প্রায় বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী হইয়াছিল। রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদিগের প্রাচীন কুলগ্রন্থে “রাঢ়ী-বারেন্দ্রদোষ-কারিকা” হইতে জানা যায় যে, বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের মধ্যেও অনেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধাচারী হইয়া উপবীতবর্জ্জিত হইয়াছিলেন,—অবশেষে বৈদিক ধর্ম্মানুরক্ত মহারাজ বিজয়সেনের অভ্যুদয়ে তাঁহারা বৈদিক ব্রাহ্মণগণের সাহায্যে পুনঃসংস্কৃত হইয়াছিলেন।[ব্যাখ্যা ১] বিজয়সেন ও তৎপুত্র


  1. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৬ষ্ঠ অংশ ৩৩ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত বিবরণ দ্রষ্টব্য।
বল্লালসেনের সময়ে দক্ষিণ বারেন্দ্রের বিপ্রগণ পুনরায় বৈদিকাচার গ্রহণ করিলেও উত্তর-বারেন্দ্রে বহুকাল বৌদ্ধাচার প্রচলিত ছিল। এই কারণেই বোধ হয়, দক্ষিণ-বারেন্দ্রের বিপ্রগণ উত্তর-বারেন্দ্রের সহিত সম্বন্ধত্যাগ করেন। বারেন্দ্রদিগের মধ্যে বৈদিকাচার ও বেদচর্চ্চা অনেকটা লোপ হইয়াছিল, তাহা হলায়ুধের ব্রাহ্মণ-সর্ব্বস্ব পাঠ করিলেও জানা যায়। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে যজুর্ব্বেদীর সংখ্যাই অধিক। তাঁহাদিগকে বৈদিকাচার উপদেশ দিবার অভিপ্রায়েই সুপ্রসিদ্ধ বৈদিক ধর্ম্মাধিকারী হলায়ুধ “ব্রাহ্মণসর্ব্বস্ব” রচনা করেন।[ব্যাখ্যা ১]

 রাজা বিজয়সেনের শাসনকালে মুর্শিদাবাদ জেলার উত্তরে প্রবাহিত গঙ্গা হইতে দক্ষিণে উৎকলের সীমা পর্য্যন্ত সর্ব্বত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মপ্রচারের বিপুল আয়োজন চলিয়াছিল। তিনি দেবব্রাহ্মণভক্ত ও বৈদিকাচার-প্রবর্ত্তনে বিশেষ উৎসাহদাতা ছিলেন বলিয়া, কুলগ্রন্থকারগণ তাঁহাকে ২য় আদিশূর নামে পরিচিত করিয়া গৌরবান্বিত করিয়াছেন। বলিতে কি, মহারাজ বিজয়সেন ও তৎপুত্র শ্যামলের প্রভাবে গৌড়মণ্ডলের উচ্চ জাতীয় জনসাধারণের হৃদয়ে আবার দেবদ্বিজ-ভক্তি উদ্রিক্ত হইতেছিল।

 ১০০১ শকে (১০৭৯ খৃষ্টাব্দে) অর্থাৎ মহারাজ বিজয়সেনের কুরঙ্গেষ্টি-যজ্ঞের সপ্ত বর্ষ পরে শ্যামলবর্ম্মা বিক্রমপুরে শাকুনসত্র উপলক্ষে পুনরায় কর্ণাবতী হইতে শুনক, শৌনক, শাণ্ডিল্য, বশিষ্ঠ, সাবর্ণ প্রভৃতি গোত্রের বৈদিক বিপ্রগণকে আনাইয়া সম্মানিত করিয়াছিলেন। তাঁহাদের বংশধরগণ নানা শাসনগ্রাম লাভ করিয়া বঙ্গবাসী হইয়াছিলেন। এখনও তাঁহাদের বংশধরগণ পাশ্চাত্য বৈদিকসমাজে প্রধান বলিয়া সম্মানিত।

 মহারাজ বিজয়সেন ও শ্যামলবর্ম্মা তখনকার শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ সমাজের হৃদয় অধিকার করিয়া বসিয়াছিলেন। সকলেই বিজয়কে হিন্দুধর্ম্মের রক্ষক বলিয়া মনে করিতেন। তাঁহারই প্রভাবে তৎপুত্র বল্লালসেন ব্রাহ্মণসমাজের ব্যবস্থাপক হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন।

 মহারাজ বিজয়ের তিন পুত্র—মল্ল, শ্যামল ও বল্লাল। মল্ল সুবর্ণরেখা-তীরবর্ত্তী কাশীপুরী নামক সামন্তরাজ্যে অধিষ্ঠিত ছিলেন। শ্যামল পিতার সহিত দিগ্বিজয়ে নিযুক্ত হন। বিজয়ের গৌড়-বঙ্গের অধিরাজ্যে অভিষেককালে শ্যামলও বিক্রমপুরে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং বিক্রমপুরের তৎপূর্ব্ববর্ত্তী বর্ম্মরাজগণের ন্যায় তিনিও বর্ম্মোপাধি[ব্যাখ্যা ২] গ্রহণ করিয়াছিলেন।


  1. “কৃৎস্নবেদাধ্যয়নাসমর্থানাং বারেন্দ্রকদ্বিজাতীনাং কাণ্বশাখিবাজসনেয়িনাং কর্ম্মানুষ্ঠানার্থং…গার্হস্থ্যকর্ম্মোপযুক্তমন্ত্রব্যাখ্যা প্রষ্টোতব্যা।”—
    (হলায়ুধের ব্রাহ্মণসর্ব্বস্ব)
  2. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৩য়াংশ ২১-২৪ পৃষ্ঠায় বিজয়পুত্র শ্যামলের “বর্ম্মা” উপাধি ধারণের কারণ ও ইতিহাস দ্রষ্টব্য।