বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪৩৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (হাবসীবংশ)
[৪৩৬]
বঙ্গদেশ (খৃঃ ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দে অবস্থা)

পড়িয়াছেন, এমন সময়ে সাধারণের বিস্ময় সমুৎপাদন করিয়া খোজা-সর্দ্দার বারিক রাজপরিচ্ছদে ভূষিত হইয়া সিংহাসনে সমাসীন হইলেন। ঘটনাচক্রে সেই সময়ে উজীর প্রধান খাঁ জাহান এবং হাবসীশ্রেষ্ঠ সেনাধ্যক্ষ মালিক আণ্ডেল রাজধানীতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁহারা রাজধানী রক্ষার্থ পাইকমাত্র নিযুক্ত রাখিয়া সমগ্র সেনাদল লইয়া কোন হিন্দুরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিলেন, পাইক-সর্দ্দারও পূর্ব্ব হইতে উৎকোচ গ্রহণ করিয়া তূষ্ণীম্ভাব ধারণ করিয়াছিল, সুতরাং বারিকের সিংহাসন গ্রহণে সে কোনও আপত্তি উত্থাপন করিল না। খোজা বারিক সুলতান শাহজাদা উপাধি ধারণ করিয়া ১৪৯১ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালার সিংহাসনে আরোহণ করিলেন।

 শাহজাদা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইলেন বটে, কিন্তু তাহা সাধারণের অভিমত হইল না। মালিক আণ্ডেল সুলতানকর্ত্তৃক স্বপদে নিয়োগাধিকার সত্ত্বেও তাঁহার বিরোধী হইয়া রাত্রিযোগে তাঁহার অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্ব্বক সহযোগী যুগ্রিস খাঁর সাহায্যে তাঁহাকে নিহত করিলেন এবং সাধারণের অভিপ্রায়ানুসারে উক্ত বর্ষে সৈফ্ উদ্দীন্ ফিরোজশাহ হাবসী নাম ধারণ করিয়া বাঙ্গালার মসনদে উপবিষ্ট হইলেন। তিনি যেরূপ বীর ছিলেন, তদনুরূপ দয়াও তাঁহাকে অলঙ্কৃত করিয়াছিল। তাঁহার উদারতা সম্বন্ধে এইরূপ একটী কিংবদন্তী আছে,—একসময়ে তিনি দরিদ্রদিগকে ১ লক্ষ মুদ্রা ভিক্ষাদানার্থ মন্ত্রীর প্রতি আদেশ করেন। মন্ত্রিবর মনে ভাবিলেন, ‘লক্ষ টাকা নিতান্ত কম নয়। সুলতান বোধ হয়, লক্ষ টাকার পরিমাণ না জানিয়াই এত অধিক অর্থ বিতরণের আদেশ করিয়াছেন। সুতরাং এই অর্থ তাঁহাকে চক্ষে না দেখাইয়া বিতরণ করা হইবে না; এই যুক্তি করিয়া তিনি লক্ষ পরিমাণ রৌপ্যমুদ্রা সুলতানের যাইবার পথের ধারে রাখিয়া দিলেন। সুলতান তাহাতে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, এ মুদ্রা কিসের? উজীরপ্রবর তাহা ভিক্ষার্থ দেয় বলিয়া অভিবাদন করিলেন। তাহাতে সুলতান বলিয়াছিলেন, “এই সামান্য মুদ্রা কয়জনকে দিবে। ইহার দ্বিগুণ পরিমাণ বিতরণ করিয়া দাও।”

 ফিরোজ শাহ গৌড়নগরে একটা সুবৃহৎ মসজিদ্, মিনার ও সুদৃশ্য বাঁধা পুষ্করিণী নির্ম্মাণ করিয়া যান। ঐ কীর্ত্তিগুলি আজিও সাধারণের দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে।

 প্রায় ৩ বৎসর কাল রাজত্ব করিয়া ১৪৯৪ খৃষ্টাব্দে ফিরোজ শাহ ভবলীলা সম্বরণ করিলে ওমরাহগণ তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র নাসির উদ্দীন্ মাহ্মূদ শাহকে[ব্যাখ্যা ১] • রাজা করেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হাবসী-


  1. হাজি মহম্মদ কান্দাহারীকৃত ইতিহাসে লিখিত আছে মাহ্মূদ শাহ হাবসীজাতীয় ছিলেন না, তিনি পূর্ব্ববর্ণিত সুলতান ফতেশাহের পুত্র। তাঁহার মাতা সেনাপতি মালিক আণ্ডেলের পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন।
জাতীয় উজীর হাবেশ খাঁই রাজ্যের সর্ব্বময় কর্ত্তা ছিলেন। মন্ত্রিবরের অপ্রিয় আচরণে বিরক্ত ও উত্ত্যক্ত হইয়া অপরাপর হাবসীগণ ঈর্ষান্বিত হইয়া তাঁহার বিনাশের চেষ্টা পান। সেই সময়ে সিদ্দি বদর দেওয়ানে অত্যাচারী উজীরকে নিহত করিয়া সুলতানের বন্ধনদশা মুক্ত করিয়া দেন। মাহ্মূদ শাহের রাজ্যকাল একবৎসর অতিক্রম করিতে না করিতে উক্ত সিদ্দি বদর সুলতানকে গোপনে বধ করিয়া বঙ্গসিংহাসন অধিকার করেন।

 সিদ্দি বদর দেওয়ানে ১৪৯৫ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালার অধীশ্বর হইয়া মুজঃফর শাহ নাম গ্রহণ করিলেন। এরূপ অত্যাচারী ও যথেচ্ছাচারী রাজা কখনও বঙ্গসিংহাসনে উপবেশন করেন নাই। তিনি প্রথমে তুর্কজাতীয় ওমরাহগণের নিধনসাধন করিয়া স্বীয় বিজাতীয় জ্বালা নির্ব্বাপিত করেন। তদনন্তর তিনি হিন্দুসামন্তরাজ ও জমিদারদিগকে নির্জ্জিত, নিহত ও বিধ্বস্ত করিয়া তাঁহাদের যথাসর্ব্বস্ব লুণ্ঠন করিলেন। ইহাতেও তাঁহার কলুষময় জীবনের বিজাতীয় তৃষ্ণার বিলয় হয় নাই। তিনি সকল প্রকার অত্যাচারেই স্বীয় প্রজাবর্গকে উত্ত্যক্ত করিয়াছিলেন। অবশেষে তাঁহার প্রধানমন্ত্রী মক্কাবাসী সৈয়দ হুসেন সরিফ মুসলমান ও হিন্দু সর্দ্দারবৃন্দে মিলিত হইয়া ১৪৯৭-৮ খৃষ্টাব্দে রাজধানীতে সুলতানকে অবরোধ করেন। এই সময়ে সুলতানের অধীনে ৫ হাজার হাবসী এবং ২৫ হাজার পাঠান ও বঙ্গীয় সেনা ছিল। ৪ মাস গৌড়নগরে অবরুদ্ধ থাকিয়া সুলতান মনে করিলেন যে, এই বৃহতী বাহিনী লইয়া তিনি অনায়াসেই বিদ্রোহিদলকে বিপর্য্যস্ত করিতে পারিবেন। এই আশায় উৎফুল্ল হইয়া তিনি দুর্গপ্রাকার অতিক্রমপূর্ব্বক গৌড়নগর-সম্মুখস্থ সুবৃহৎ ময়দানে যুদ্ধার্থ অবতীর্ণ হইলেন। ঘোরতর যুদ্ধের পর সুলতান রণক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জ্জন করিলেন (১৪৯৮ খৃঃ)। তাঁহার সঙ্গে গৌড়প্রাঙ্গণে ২৩ হাজার সেনা প্রাণ দিয়াছিলেন। কথিত আছে, বিদ্রোহিদলের নেতৃবর্গ বন্দীভাবে সুলতান মুজঃফর শাহের সম্মুখে আনীত হইলে তিনি স্বহস্তে তাহাদের শিরশ্ছেদ করিতেন। নিজাম্ উদ্দীন্ বলেন, মন্ত্রিপ্রধান সৈয়দ হুসেন পাইকদিগের সহিত ষড়যন্ত্র করিয়া রাত্রিতে শয্যাগৃহে তাঁহাকে নিহত করেন।

 বিগত সার্দ্ধৈক শতাব্দ কালের মুসলমান ইতিহাস আলোচনা করিলে বেশ বুঝা যায় যে, ধর্ম্মরক্ষাকল্পে হিন্দুগণ এক সময়ে যেরূপ নির্য্যাতন ভোগ করিয়াছিলেন, অন্য সময়ে আবার তাঁহারা সহৃদয় মুসলমান নরপতিবর্গের করুণায় স্বধর্ম্মপালনে সেইরূপই সামর্থ্যবান্ হইয়াছিলেন। দুঃখের পর সুখোদয়, অত্যাচারের ও অনাদরের পর সমাদর যেমন হর্ষজনক, মুসলমান রাজন্যগণের এই বিজাতীয় বিদ্বেষের পর হিন্দুসমাজের প্রতি সকরুণ কৃপাকটাক্ষপাত সেইরূপ হৃদয়ানন্দকর হইয়াছিল। ইহার উপর মুসলমান