লাভ করিয়াছিলেন, এতদ্ভিন্ন আরও অনেকে সম্মানিত হইয়াছিলেন। রাঢ়ীয় অপেক্ষা বারেন্দ্রদিগের সহিতই অধিক পরিমাণে মুসলমান রাজসংস্রব ঘটিয়াছিল; তাঁহারা গৌড়াধিপের অতি নিকটেই বাস করিতেন; মুসলমান রাজসভায় তাঁহাদের সর্ব্বদাই গতিবিধি ছিল, এ কারণ তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান রাজাদিগের নিকট উচ্চ পদ লাভ করিয়াছিলেন, তজ্জন্য রাঢ়ীশ্রেণী অপেক্ষায় বারেন্দ্রশ্রেণী বেশী বিষয়ী হইয়া পড়িয়াছিলেন এবং মুসলমান রাজসরকারে তাঁহাদের প্রভাব অত্যন্ত বৃদ্ধি পাইয়াছিল, তাহারই ফলে খৃষ্টীয় ১৪শ শতাব্দীর শেষ ভাগে ভাতুড়িয়ার হিন্দু জমিদার রাজা গণেশ মুসলমান অধিপতির সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই গণেশই বারেন্দ্রমন্ত্রী নরসিংহ নাড়িয়ালের পরামর্শে মুসলমান নৃপতিকে বিনাশ করিয়া সমস্ত গৌড়ের অধীশ্বর হইয়াছিলেন, তিনি হিন্দুধর্ম্ম ও হিন্দুরাজ্য বিস্তার করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেও তাঁহার চাল চলন ও আদব কায়দায় যথেষ্ট মুসলমানী প্রভাব সংক্রমিত হইয়াছিল। তিনি এক জন প্রকৃত হিন্দু হইলেও তাঁহার রাজত্বকালে যে সকল মুদ্রা প্রচলিত হয়, তাহাতে “বয়াজিদ্ শাহ” এই মুসলমানী নাম অঙ্কিত দেখা যায়। তিনিও যে মুসলমান নৃপতিগণের অনুকরণে বাদশাহী নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা তাঁহার প্রচলিত মুদ্রা হইতেই প্রমাণিত হইতেছে।
রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণপ্রবর অমরকোষের সুপ্রসিদ্ধ টীকাকার বৃহস্পতি গণেশবংশীয় মুসলমান অধিপতির নিকট “রায়মুকুট” উপাধি এবং তাঁহার প্রিয়পুত্র কবীন্দ্র শ্রীরাম “বিশ্বাস” উপাধি লাভ করেন।
যাহা হউক, এই সময় ও পরবর্ত্তীকালের ইতিহাস আলোচনা করিলেও বেশ বুঝা যায় যে, হিন্দু ও মুসলমান ক্রমেই ঘনিষ্ঠতা সূত্রে আবদ্ধ হইতেছিল, মুসলমান নরপতিগণ হিন্দুর প্রতি অভক্তি বা অবহেলা প্রদর্শন করিতেন না। তাঁহারা হিন্দু সমাজকে আয়ত্তাধীনে আনিবার জন্য সমাজনেতা ব্রাহ্মণগণকে হস্তগত করিতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁহারা বাঙ্গালায় স্থায়িপ্রভাব বিস্তারোদ্দেশেই মান্য, গণ্য ও বিচক্ষণ বাঙ্গালীদিগকে রাজকীয় উচ্চপদে নিয়োগ করিতেন। রাজসংস্রব ক্রমশঃই বিষম হইতে বিষময় হইয়া দাঁড়াইল। মুসলমান দরবারে নিরন্তর গতিবিধি নিবন্ধন ব্রাহ্মণেরাও মুসলমানী আদবকায়দা, চালচলন বা রীতি-নীতি অভ্যাস করিতে বাধ্য হইলেন। ক্রমে এই সংক্রামক ব্যাধিতে অনেক নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণসন্তানও আক্রান্ত হইয়াছিলেন।
হিন্দু-মুসলমানের এই মেশামিশির ফলে রাজা গণেশ কর্ত্তৃকএই অত্যাচারের দিনেও নসির শাহ, বার্ব্বক শাহ, যূসুফ শাহ, সেকন্দর শাহ ও ফতেশাহ নামধেয় কয়জন ধর্ম্মনিষ্ঠ সুলতান শান্তিময় শাসন-পদ্ধতির ব্যবস্থা করেন। বার্ব্বকশাহ রাজ্যশাসনের সুবিধার্থ হাবসী ও খোজাদিগকে সেনাবিভাগে এবং যোগ্যতানুসারে অন্যান্য রাজকর্ম্মে নিয়োগ করিয়া যে বিষময় বীজ বপন করিয়া যান, তাহাই অঙ্কুরিত হইয়া কালে হিন্দুসমাজের সর্ব্বনাশ সাধন করে। মুসলমান রাজপুরুষগণ ব্রাহ্মণদিগকে মুসলমান করিবার অভিপ্রায়ে অতি জঘন্যরূপে নির্যাতন আরম্ভ করেন। উপর্য্যুপরি অত্যাচারে অনেক হিন্দু বংশ মুসলমানদোষসংশ্লিষ্ট হয়। বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ কুল, জাতি ও মানের ভয়ে বঙ্গদেশ ছাড়িয়া ভিন্নদেশে পলাইয়া যান। অনেকে মানসম্ভ্রমরক্ষা করিতে না পারিয়া মুসলমানস্রোতে জাতিকুল বিসর্জ্জন দিয়াছিলেন। এই পাঠান-শাসনকালে হিন্দুসমাজের বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ কুলীনসমাজেরও তৎকালে যথেষ্ট বিশৃঙ্খলা সমুৎপাদিত এবং তাহা হইতেই এদেশে অনেক সামাজিক পরিবর্ত্তন প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল।
১৪৭৪ খৃষ্টাব্দে বার্ব্বক শাহের মৃত্যুর পর, তৎপুত্র যূসুফ্ শাহ গৌড়-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁহার ন্যায়পরতা ও দয়াদাক্ষিণ্যগুণে হিন্দু-প্রজা শান্তির মুখ দেখিতে পাইল। ১৪০২ শকে অর্থাৎ ১৪৮০ খৃষ্টাব্দে দেবীবর ঘটক, রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণসমাজের সংস্কার সাধন করিয়া মেলনিয়ম প্রচারিত করিলেন।
এই ঘটনার কিছুকাল পূর্ব্বে বারেন্দ্র কুলশাস্ত্রবিশারদ উদয়নাচার্য্য ভাদুড়ী বারেন্দ্র কুলীনসমাজকে আটটী পটিতে বিভক্ত করেন। এদিকে দক্ষিণ-বঙ্গে দেবীবরের সমকালবর্ত্তী পুরন্দর বসু দক্ষিণরাঢ়ীয় কায়স্থসমাজে পুত্র পৌত্রাদি ক্রমে সমান পর্য্যায়ে
- ↑ ঈশাননাগরকৃত অদ্বৈত প্রকাশে লিখিত আছে যে, অদ্বৈতাচার্য্যের পিতামহ নৃসিংহ বা নরসিংহ নাড়িয়াল সিদ্ধশ্রোত্রিয় ও আরু ওঝার সন্তান।
“যাহার মন্ত্রণা বলে শ্রীগণেশ রাজা।
গৌড়ের বাদশাহ মারি গৌড়ের হইল রাজা।” (অদ্বৈতপ্রকাশ)