হইলেন (১৫৫৩ খৃঃ)। এই সংবাদ পাইয়া মহম্মদ খাঁ স্বাধীনতা অবলম্বন করিলেন এবং জৌনপুরের কতকাংশ অধিকার করিয়া লইলেন। মহম্মদ খাঁ সূর স্বনামে মুদ্রাঙ্কণ করে। কিংবদন্তী আছে, তিনি বিশেষ ন্যায়পরতার সহিত রাজ্যশাসন করিয়াছিলেন। তাঁহার অবৈধ আচরণে ক্রুদ্ধ হইয়া পরবৎসর মহম্মদ আদিল স্বীয় হিন্দুসেনাপতি হিমুকে বাঙ্গালায় প্রেরণ করেন, হিমুর হস্তে কুল্পীর নিকটস্থ ছাপরঘাটার যুদ্ধে বঙ্গেশ্বর পরাজিত ও নিহত হইলেন (১৫৫৫)। মহম্মদ খাঁর মৃত্যুর পর তৎপুত্র খিজির খাঁ মুসলমান সর্দ্দারদিগের অভিমতে বাহাদুর শাহ নাম ধারণ করিয়া বাঙ্গালার মস্নদে আরোহণ করিলেন। বাহাদুর শাহ সদলে গৌড়ে উপনীত হইয়া দেখিলেন, সর্দ্দার শাহবাজ খাঁ দিল্লীশ্বর মহম্মদ আদিলের পক্ষ হইয়া বঙ্গসিংহাসন অধিকার করিয়াছে। তিনি শাহবাজকে নিহত করিয়া স্বীয় পিতৃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করিলেন। ৯৬৩ হিজিরার মুঙ্গেরের যুদ্ধে আদিল শাহকে সংহার করিয়া তিনি পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ লইলেন (১৫৫৬)। অনন্তর কিছুকাল রাজপরিবর্ত্তননিবন্ধন বাঙ্গালায় অরাজকতা ঘটিল। মুঙ্গেরে যুদ্ধজয়ের পর বাহাদুর শাহ বাঙ্গালার একমাত্র অধীশ্বর হইলেন। তিনি পুত্রনির্ব্বিশেষে কএকবৎসর প্রজা পালন করিয়া ৯৬৮ হিজিরায় (১৫৬০-১ খৃষ্টাব্দে) গৌড়নগরে দেহত্যাগ করেন।
অপুত্রক অবস্থায় বাহাদুর শাহের মৃত্যু হইলে, তদীয় ভ্রাতা জলাল্ উদ্দীন্ বঙ্গসিংহাসনে আরোহণ করেন। ৯৭১ হিজিরায় গৌড়নগরে তাঁহার মৃত্যু হইলে তাঁহার যুবকপুত্র সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এই বালক রাজাকে গোপনে নিহত করিয়া গিয়াস্ উদ্দীন্ বাঙ্গালার শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করিলেন। এইরূপ অরাজকতায় ও অত্যাচারে কিছুকাল অতিবাহিত হইলে পাঠানজাতীয় কিরাণীবংশীয় সুলেমান এই সময়ে ইস্লাম্ শাহ কর্ত্তৃক বেহারের শাসন কর্ত্তৃত্বপদে নিযুক্ত হন, তিনি বাহাদুর শাহের বন্ধু ছিলেন। মুঙ্গের-যুদ্ধে বঙ্গেশ্বরের পৃষ্ঠপোষক হইয়া তিনি দিল্লীশ্বরকে পরাজিত করেন। জলাল্ উদ্দীন পুত্র গিয়াসের অত্যাচারে নিহত হইয়াছে শুনিয়া তিনি স্বীয় ভ্রাতা তাজ খান্কে পাঠাইয়া দিয়া বাঙ্গালা অধিকার করেন। ১৫৬৪ অব্দে তাজখাঁর মৃত্যু হয়, এবং সুলেমান আসিয়া গৌড়ের অপরপারবর্ত্তী তাঁড়া নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন।
এই সময়ে হুমায়ুন শাহের পুত্র মোগলকুলরত্ন অকবর দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করিয়া চতুর্দ্দিকে আপনার ক্ষমতা বিস্তার করিতেছিলেন। সুলেমান তাঁহার নিকটে উপহার প্রেরণ করেন, তাঁহার এই চতুরতায় সম্রাট্ মুগ্ধ হইয়া পড়িলেন। তাহাতে সম্রাটের সহিত তাঁহার সদ্ভাব অক্ষুণ্ণ রহিল।
১৫৬৫-৬৬ খৃষ্টাব্দে রোহতাস্ দুর্গ আক্রমণ ও ১৫৬৭ খৃষ্টাব্দে উড়িষ্যাবিজয় সুলেমানের রাজত্ব-সময়ের প্রধান ঘটনা। সম্রাট্ অকবর শাহের আগমনে তিনি রোহতাস্ দুর্গের অবরোধ ত্যাগ করিয়া স্বীয় রাজধানীতে প্রত্যাবৃত্ত হন। কিন্তু ১৫৬৭ খৃঃ অব্দে তিনি স্বীয় বিখ্যাত সেনাপতি কালাপাহাড়কে (রাজু) উৎকলে প্রেরণ করেন। কালাপাহাড় তথাকার শেষ স্বাধীনরাজা মুকুন্দদেবকে পরাস্ত করিয়া উড়িষ্যা অধিকার করিলেন এবং অনেক দেবমূর্ত্তি ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। কালাপাহাড় প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন; পরে বঙ্গীয় মুসলমান রাজবংশীয় কোন রমণীর প্রণয়ে পড়িয়া মুসলমান ধর্ম্ম গ্রহণ করেন; এবং হিন্দু দেবদেবীর শত্রু হইয়া উঠেন। ইনি ১৫৫৩ খৃষ্টাব্দে কামরূপ আক্রমণ করেন ও অসংখ্য দেবালয় ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করেন। উড়িষ্যা ও কামরূপের অধিবাসীরা এখনও কালাপাহাড়ের নাম ভুলে নাই।
খৃষ্টীয় ১৫৭৩ অব্দে সুলেমানের মৃত্যু হয় এবং তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্ত্র বয়াজিদ রাজা হন। আফগান সর্দ্দারেরা বয়াজিদের আচরণে উত্ত্যক্ত হইয়া পর বৎসর তাঁহাকে বিনষ্ট করিয়া তাঁহার ভ্রাতা দাউদকে রাজসিংহাসন প্রদান করেন। দাউদ রাজ্যশাসনভার গ্রহণ করিয়াই দেখিলেন যে, তাঁহার ১৪০০০০ পদাতিক, ৪০০০০ অশ্বারোহী, ২০০০০ কামানাদি অস্ত্র এবং ৩,৬০০ হস্তী ও বহু শত যুদ্ধ-নৌকা প্রস্তুত রহিয়াছে। এই বিস্তৃত সেনাদল লইয়া তিনি সম্রাট্ অকবর শাহের সমকক্ষ হইতে পারেন ভাবিয়া তাঁহার হৃদয়ে রাজ্যবিস্তারের বাসনা জন্মিল। তিনি বাঙ্গালা ও বেহারের সর্ব্বত্র স্বনামে খুতবা পড়িতে হুকুম দিলেন এবং জমানিয়া নামক গাজিপুর সন্নিহিত একটী মোগল দুর্গ বলপূর্ব্বক হস্তগত করিলেন। অকবর দাউদের বিরুদ্ধে সেনাপতি মুনাইম খাঁ এবং রাজা টোডরমল্লকে পাঠাইলেন। ১৫৭৪ খৃষ্টাব্দে কএকদিন অবরোধের পর পাটনা অধিকৃত হইল এবং বাঙ্গালায় মোগল সৈন্য প্রবেশ করিল, দাউদ নৌকারোহণে উড়িষ্যায় পলায়ন করিলেন। পরে মেদিনীপুর এবং জলেশ্বরের মধ্যবর্ত্তী মোগলমারি (তুকারো) নামক স্থানে মোগল ও পাঠান সৈন্যের একটী ঘোরতর যুদ্ধ হয় (১৫৭৫ খৃঃ)। প্রথমে পাঠানদিগেরই জয়ের সম্ভাবনা হইয়া উঠে, কেবল রাজা তোডরমলের অদৃষ্টগুণে মোগলদিগেরই জয়লাভ হইল। দাউদ সমরক্ষেত্র হইতে পলায়ন করেন; কিন্তু মোগলসেনাপতিরা কটক পর্য্যন্ত তাঁহার অনুসরণ করিলে, তিনি তাঁহাদিগের হস্তে আত্মসমর্পণ করিলেন এবং তাঁহাদিগের অনুগ্রহে সম্রাটের প্রভুত্বাধীন কটক রাজ্যের শাসনাধিকার লাভ করেন। [দাউদ খাঁ দেখ।]
সেনাপতি মুনাইম খাঁ, তাঁড়ানগর হইতে প্রত্যাগমন করিয়া