তিন মাস অবস্থিতি করিলেন। অবশেষে কোরাণ স্পর্শ করিয়া শের অঙ্গীকার করিলেন যে, যদি হুমায়ুন তাঁহাকে বাঙ্গাল ও বেহারের অধীশ্বর বলিয়া স্বীকার করেন, তাহা হইলে তিনি সম্রাটের প্রতিগমনের কোন প্রতিবন্ধকতা করিবেন না। এই সংবাদ শুনিয়া মোগলেরা কিঞ্চিৎ অসাবধান হইয়া আমোদ প্রমোদ করিতে লাগিল; এবং রাত্রিকালে শের তাহাদিগকে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ব্বক সহসা আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিল। হুমায়ুন অতি কষ্টে গঙ্গা সন্তরণ করিয়া প্রাণরক্ষা করিলেন এবং অত্যল্প সহচর সঙ্গে আগ্রায় উপস্থিত হইলেন।
অতঃপর শের শা বাঙ্গালার শাসনকার্য্যের বন্দোবস্ত করিয়া ৯৪৬ হিঃ শেষভাগে ৫০ হাজার পাঠান সৈন্য লইয়া হুমায়ুনের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কনোজের নিকট উভয় পক্ষে যুদ্ধ বাঁধিল (১৫৪০ খৃষ্টাব্দে); হুমায়ুন পরাস্ত হইয়া পারস্যে প্রস্থান করিলেন। শের দিল্লীশ্বর হইলেন।
শের যখন দিল্লীশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধোদ্যম করেন, তখন তিনি খিজির খাঁকে বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া যান। খিজির খাঁ এই পদোন্নতির পর বঙ্গের শেষ স্বাধীন নরপতি মাহ্মূদ শাহের কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। সেই সূত্রে পূর্ব্ব রাজবংশের অনুগৃহীত অনেক আফগান তাঁহার দলভুক্ত হয়। তাহাতে স্পর্দ্ধিত হইয়া খিজির স্বীয় প্রভু শের খাঁর অধীনতা অমান্য করিয়া রাজদ্রোহিতার ভাব প্রকাশ করেন। এই বিদ্রোহ নিবারণার্থ শের খাঁকে আর একবার বাঙ্গালায় আসিতে হয়। তৎপরে তিনি এদেশকে কয়েক খণ্ডে বিভক্ত করিয়া, প্রত্যেক খণ্ডের এক এক জন শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করেন। তাঁহাদের সকলের কার্য্যাবলী পরিদর্শন করিতে কাজী ফজিলাৎ নামে একজন উচ্চতম কর্ম্মচারী নিযুক্ত হন। তদনন্তর ১৫৪১ খৃষ্টাব্দে তিনি আসিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। সেখানে ১৫৪৫ খৃষ্টাব্দে শেরের মৃত্যু ঘটে। তাঁহার চরিত্র লক্ষ্য করিলে ধর্ম্ম ও পাপের সমস্রোত প্রবাহিত দেখা যায়। তিনি একজন সমরকুশল সেনাপতি হইলেও বিশ্বাসঘাতকতায় স্বীয় চরিত্র কলঙ্কিত করিয়াছিলেন, লোকহিতকর কার্য্যেও তাঁহার মতি ছিল। তিনি উৎপন্নের এক চতুর্থাংশ রাজকর ধরিয়া বাঙ্গালার ভূমির বন্দোবস্ত করিয়া যান; এই বন্দোবস্ত অবলম্বন করিয়াই অকবর শাহের সময় এতদ্দেশে রাজস্ব নির্দ্ধারিত হয়। শের শাহ সুবর্ণগ্রাম হইতে সিন্ধুনদ পর্য্যন্ত একটী রাস্তা প্রস্তুত করাইয়া তাহার দুধারে বৃক্ষ বসান এবং প্রয়োজনানুরূপ পান্থনিবাস নির্ম্মাণ ও কূপ খনন করান। তিনিই প্রথমে ভারতবর্ষে ঘোড়ার ডাকের সৃষ্টি করেন। তাঁহার রাজত্বে দস্যুভয় ছিল না। পথিক ও বণিক্গণ স্ব স্ব দ্রব্য পথি মধ্যে নিঃক্ষেপ করিয়া স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইত।বাঙ্গালার স্বাধীন পাঠান নরপতি বর্গ।
| খৃঃ | হিঃ অঃ | বঙ্গেশ্বর | সাময়িক দিল্লীশ্বর |
| ১৩৩৬ | ৭৩৭ | ফখ্র্ উদ্দীন্ মুবারক শাহ | মহম্মদ তোগলক |
| ১৩৪১ | ৭৪২ | আলা উদ্দীন্ আলি শাহ (গৌড়) | ঐ |
| ১৩৪৩ | ৭৪৪ | ইল্য়াস্ শাহ (গৌড়) | ঐ |
| ১৩৪৬ | ? | গাজি শাহ (পূর্ব্ববঙ্গ) | ঐ |
| ১৩৫২ | ? | ইল্য়াস শাহ (সর্ব্ববঙ্গ) | ফিরোজ শাহ |
| ১৩৫৮ | ৭৫৯ | সেকন্দর শাহ | ঐ |
| ১৩৬৮ | ৭৬৯ | গিয়াস উদ্দীন্ শাহ বিন্ সেকন্দর | ঐ |
| ১৩৭৪ | ৭৭৫ | সৈফ্উদ্দীন্ বিন্ গিয়াসউদ্দীন্ | মহম্মদ শাহ |
| ১৩৮৪ | ৭৮৫ | হামজা সুলতান উস্-সলাতিন | নসিরৎ শাহ |
| ? | ? | শাহাব উদ্দীন্ বয়াজিদ শাহ | মাহ্মূদ শাহ |
| ১৩৮৬ | ৭৮৭ | রাজা গণেশ | ঐ |
| ১৩৯২ | ৭৯৪ | জালাল উদ্দীন্ মহম্মদ শাহ বিন্ গন্শা | খিজির খাঁ |
| ১৪০৯ | ৮১২ | আহ্মদশাহ বিন্ জলাল | মুবারক শাহ |
| ১৪২৭ | ৮৩০ | নাসির উদ্দীন্ মাহ্মুদ শাহ | আলম শাহ |
| ১৪৫৭ | ৮৬২ | বার্ব্বক শাহ | বহলোল লোদী |
| ১৪৭৪ | ৮৭৯ | যুসুফশাহ বিন্ বার্ব্বক | ঐ |
| ১৪৮২ | ৮৮৭ | সেকন্দর শাহ | ঐ |
| ১৪৮২ | ৮৮৭ | ফতে শাহ | ঐ |
| ১৪৯১ | ৮৯৬ | সুলতান শাহজাদা | ঐ |
| ১৪৯২ | ৮৯৭ | সৈফ উদ্দীন্ ফিরোজ শাহ হাব্সী | ঐ |
| ১৪৯৪ | ৮৯৯ | নাসির উদ্দীন্ মাহ্মুদ | সেকন্দর |
| ১৪৯৫ | ৯০০ | মুজঃফর শাহ হাবসী | ঐ |
| ১৪৯৮ | ৯০৩ | আলা উদ্দীন্ সৈয়দ হুসেন শাহ | ঐ |
| ১৫২১ | ৯২৭ | নসরত শাহ | ইব্রাইম ও বাবর |
| ১৫৩২ | ৯৩৯ | ফিরোজ শাহ ৩য় | হুমায়ুন |
| ১৫৩৪ | ৯৪০ | মাহ্মূদ শাহ বিন্ হুসেন শাহ—ইনিই প্রকৃতপক্ষে শেষ স্বাধীন নরপতি। | |
| ১৫৩৭ | ৯৪৪ | ফরিদ্ উদ্দীন্ শের শাহ | ঐ |
| ১৫৩৮ | ৯৪৫ | হুমায়ুন—ইনি গৌড় বা জন্নতাবাদে রাজপাট স্থাপন করেন। | |
| ১৫৩৯ | ৯৪৬ | শেরশাহ (পুনরায়) | |
| ১৫৪৫ | ৯৫২ | মহম্মদ খাঁ | |
(তৃতীয় শাসনকাল।)