বাঙ্গালার শুভাদৃষ্ট যে, তাঁহাকে বহুকাল জীবিত থাকিতে হয় নাই। বর্ষাধিকমাত্র জীবিত থাকিয়া তিনি কালের করাল কবলে নিপতিত হইলে সম্রাট্ জাহাঙ্গীর ১০৮৭ হিজিরায় শেখ আলা উদ্দীন্ ইস্লাম খাঁকে বাঙ্গালার মসনদে এবং আফ্জল খাঁকে বেহারের শাসনকর্ত্তৃপদে নিযুক্ত করেন। ইস্লাম খান্ রাজমহল হইতে ঢাকা সহরে রাজপাট পরিবর্ত্তন করিয়া উহার নাম জাহাঙ্গীর-নগর রাখেন।
এই সময়ে আরাকান ও চট্টগ্রামবাসী পর্ত্তুগীজ দস্যুদিগের অত্যাচারে নিম্নবঙ্গ উৎসন্ন প্রায় হইতে থাকে। ১৬০৯ খৃষ্টাব্দে সিবাষ্টিয়ান গঞ্জালে সন্দ্বীপ অধিকার করেন। তথাকার মুসলমান সেনানায়ক ফতে খাঁ উপায়ান্তর না দেখিয়া একটী ক্ষুদ্র দুর্গে আশ্রয় লন।
এই সময়ে ওসমান খাঁর অধীনস্থ পাঠানেরা পুনরায় অস্ত্র ধারণ করে। ইস্লাম খাঁ সুজাত খাঁ নামক একজন দক্ষ সৈন্যাধ্যক্ষকে তাহাদিগের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। পাঠানেরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়; ওসমান যুদ্ধে নিহত হন এবং তদীয় ভ্রাতা, পুত্র ও আত্মীয়কুটুম্বগণ সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করেন (১৬১২ খৃষ্টাব্দ)।
এই বিদ্রোহাবকাশে কুতব নামে একজন রোহিলা আফগান জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠ পুত্ত্র খসরুর পরিচয় দিয়া বেহারে বিদ্রোহ উপস্থিত করে এবং পাটনা নগরী অধিকার করিয়া লয়। শাসনকর্ত্তা আফ্জল খাঁ তখন গাজিপুরে ছিলেন। তিনি এই সংবাদ শুনিয়া সসৈন্যে পাটনা অভিমুখে যাত্রা করিলেন। ছদ্মবেশী খস্রু পাটনা হইতে কয়েক ক্রোশ দূরে যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইল, কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় পুনরায় পাটনা নগরীতে আশ্রয় গ্রহণ করিল; শাসনকর্ত্তা উক্ত নগরী অবরোধ করিলেন। পরিশেষে দূরস্থ গৃহছাদ হইতে নিক্ষিপ্ত ইষ্টকের আঘাতে কুতবের প্রাণবায়ু বহির্গত হয়। [পাটনা দেখ।]
ইস্লাম খাঁর মৃত্যুর পরে (১৬১৩ খৃষ্টাব্দে) তাঁহার ভ্রাতা কাশিম খাঁ সম্রাটের আদেশে বাঙ্গালা ও উড়িষ্যার সুবাদার হন। কাশিম খাঁর রাজ্যশাসনকালে গঞ্জালে বিশ্বাসঘাতকতা দ্বারা আরাকান-রাজের যুদ্ধজাহাজগুলি হস্তগত করিয়া আরাকানের উপকূলপ্রদেশ লুণ্ঠনপূর্ব্বক গোয়ানগরীস্থ পর্ত্তুগীজদিগকে আরাকান জয় করিতে আহ্বান করে। রাজা ওলন্দাজদিগের সাহায্যে পর্ত্তুগীজদিগকে পরাজিত করেন; এবং সন্দ্বীপ আক্রমণ ও অধিকার করেন।
অতঃপর আরাকানের মগেরা বারংবার বাঙ্গালার পূর্ব্ব-দক্ষিণ প্রদেশ লুণ্ঠন করিয়া বাঙ্গালা উৎসন্ন করিতে থাকে। এই কারণে সম্রাট্ জাহাঙ্গীর কাশিম খাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে পদ-ইব্রাহিমের সময়ে বাঙ্গালার বাণিজ্যের বিশেষ উন্নতি হয়। আগ্রার রাজসভাসদ্মণ্ডলীর নিকট ঢাকার সুচিক্কণ কাপড় এবং মালদহের পট্টবস্ত্রের বিশেষ আদর হইয়াছিল। এই সময়ে ইংরাজ কোম্পানীর এজেণ্টগণ পাটনায় আসিয়া একটী কুঠী স্থাপন করেন (১৬২০ খৃষ্টাব্দে)। ইব্রাহিমের শাসনকালে বাঙ্গালাদেশে পূর্ণ শান্তি বিরাজ করিয়াছিল। সহসা (১৬২৩ খৃঃ) তাহার পরিবর্ত্তন ঘটিল; শাহ জহান পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণপূর্ব্বক দক্ষিণাপথে পরাজিত হইয়া বাঙ্গালায় প্রবেশ করিলেন। ইব্রাহিম খাঁ তাঁহার সহিত যুদ্ধে নিহত হইলেন। বাঙ্গালা ও বেহারে প্রায় দুই বৎসর রাজত্ব করিয়া শাহ জহান্ সম্রাট্-প্রেরিত সৈন্যের নিকট পরাস্ত হইলেন এবং আত্মসমর্পণ করিয়া পিতার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। তাঁহার প্রার্থনা পূর্ণ হইল, কিন্তু এই প্রদেশে অন্য শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইল।
শাহ জহানের পরে, অল্পদিন মধ্যেই (১৬২৪-২৮ খৃঃ) মহব্বত খাঁ, তৎপুত্র খান্জাদ খাঁ, মকরম খাঁ ও ফিদাই খাঁ নামে যে কয়জন ক্রমে ক্রমে বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা হন, তাঁহাদিগের সময়ে উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনাই ঘটে নাই। মকরম্ খাঁর রাজ্যশাসন সময়ে সম্রাট্ মীর্জা রুস্তম নামক এক ব্যক্তি বেহারের সুবাদার নিযুক্ত করেন। ১৬২৮ অব্দে শাহ জহান সম্রাট্ হইয়া ফিদাই খাঁকে পদচ্যুত করিয়া স্বীয় প্রিয়পাত্র কাশিম খাঁ জবুনিকে বাঙ্গালার সুবাদারী পদে নিযুক্ত করিলেন। এই সময়ে হুগলী ও চট্টগ্রামে পর্ত্তুগীজদিগের সুরক্ষিত কুঠী ছিল। এ দেশে তাঁহাদিগের যথেষ্ট ক্ষমতাও বিস্তৃত হইয়াছিল। শাহ জহান্ যখন বাঙ্গালায় ছিলেন, তখনও তিনি পর্ত্তুগীজের অত্যাচার লক্ষ্য করিয়াছিলেন, তাহারা এতদ্দেশবাসীদিগকে বলপূর্ব্বক খৃষ্টানধর্ম্মে দীক্ষিত করিত। ইহাতে বৈদেশিক পর্ত্তুগীজাতির প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া সম্রাট্ কাশিম খাঁর প্রতি তাঁহাদিগের সহিত যুদ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। সুবাদার স্বীয় পুত্ত্র ইনায়তুল্লাকে তদ্বিরুদ্ধে পাঠাইয়া হুগলি অধিকার করিলেন (১৬৩২ খৃঃ)। সেই অবধি এদেশে পর্ত্তুগীজদিগের প্রভাব কমিল, হুগলি রাজবন্দর এবং প্রধান বাণিজ্যস্থান হইয়া উঠিল। এই সময় হইতেই সপ্তগ্রামের দুঃখের দিন আরম্ভ হইল। রাজকর্ম্মচারিগণ তথা হইতে হুগলিতে চলিয়া আসায় ক্রমশঃই সপ্তগ্রাম পরিত্যক্ত হইয়াছিল।
কাশিম খাঁর পরে আজিম খান্ সুবাদার হন, তাঁহাকে দেশরক্ষাকার্য্যে অশক্ত দেখিয়া সম্রাট্ তৎপদে ইস্লাম খাঁ মশহ্দিকে নিযুক্ত করেন (১৬৩৭ খৃঃ)। অল্পকাল মধ্যে (১৬৩৮ খৃঃ) চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তা মুকুট রায় আরাকান-রাজের অধীনতা পরিত্যাগপূর্ব্বক