মোগল সম্রাটের বশ্যতাস্বীকার করিলেন। আসামবাসীরা বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া পরাজিত হইল (১৬৩৮ খৃঃ); এবং ইস্লাম খাঁ আসামে প্রবেশপূর্ব্বক অনেকগুলি দুর্গ হস্তগত করিলেন। তিনি কোচবেহার-যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু উজিরী পদ প্রাপ্ত হইয়া শীঘ্রই আগ্রায় প্রতিগমন করিলেন। তখন সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্ত্র সুলতান মহম্মদ সুজা বাঙ্গালায় সুবাদার হইলেন।
১৬৩৮ অব্দে ভোজপুরের রাজা বিদ্রোহী হন এবং তাঁহাকে শাস্তি দিবার জন্য শাহ জহান স্বীয় প্রিয় সেনাপতি আবদুল্লা খাঁকে বেহারের শাসনকর্ত্তৃপদে নিযুক্ত করেন। আবদুল্লা যাইয়া ভোজপুরের দুর্গ অধিকার করেন ও রাজার ছিন্ন মস্তক সম্রাটের নিকট পাঠান।
সুজা শাসনভার প্রাপ্ত হইয়াই ঢাকা পরিত্যাগপূর্ব্বক পুনরায় রাজমহলে রাজধানী করেন। এই সময়ে নূর-জহানের ভ্রাতুষ্পুত্র সায়েস্তা খাঁ বেহারের শাসনকর্ত্তৃত্বপদে নিযুক্ত হন। সুজার আমলে বাঙ্গালায় ইংরাজ-বাণিজ্য বদ্ধমূল হয়।
সুজার রাজ্যশাসনকালে কয়েক বৎসর প্রজাগণ সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করিয়াছিল। ১৬৫৭ খৃঃ অব্দে তিনি বাঙ্গালার রাজস্বের নূতন হিসাব প্রস্তুত করেন। ইহাতে বঙ্গভূমি ৩৪ সরকারে ও ১৩৫০ মহলে বিভক্ত হইয়া ১,৩১,১৫,৯০৭ টাকা রাজস্ব নির্দ্ধারিত হয়। অক্বর শাহের পরে এদেশে মোগলদিগের অধিকার বৃদ্ধিই এ প্রকার রাজস্ববৃদ্ধির প্রধান হেতু। প্রায় এই সময়েই উড়িষ্যা ১২টী সরকার ও ২৭৬ মহলে বিভক্ত হইয়া উহার রাজস্ব ৫৯,৬১,৪৯৭ টাকা নির্দ্ধারিত হয়। ১৬৮৫ খৃঃ অব্দে বেহারে বন্দোবস্ত হয়। এতদ্দ্বারা বেহার প্রদেশ ৮টী সরকার ও ২৪৬ পরগণায় বিভক্ত হইয়া উহার ৮৫১৫৬৮৩৲ টাকা রাজস্ব নির্দ্ধারিত হয়।
সম্রাট্ শাহ জহানের পীড়া হইলে সুজা সাম্রাজ্য-লোভে আগ্রা যাত্রা করেন; কিন্তু বারাণসীর নিকটে দারার তনয় সুলেমানের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া বাঙ্গালায় প্রত্যাবৃত্ত হন (১৬৫৮ খৃঃ)।
অরঙ্গজেব দারাকে পরাস্ত এবং মুরাদকে বন্দী করিয়া মোগল-সিংহাসন হস্তগত করেন। অতঃপর প্রয়াগের (আলাহাবাদের) নিকটে সুজার সহিত অরঙ্গজেবের একটী যুদ্ধ ঘটে। ঐ যুদ্ধে সুজা ভ্রাতৃহস্তে পরাজিত হন (১৬৫৯ খৃঃ)। সুজা প্রথমে রাজমহলে ও তদনন্তর তাঁড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। সেনাপতি মীর জুম্লা তাঁহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলে তিনি বাঙ্গালা ছাড়িয়া আরাকান রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য করেন। [সুজা দেখ।]
অনন্তর সেনাপতি মহম্মদ সৈয়দ মীর জুম্লা নবাব মুয়াজিম খাঁ খান্ খানান্ সিপা সালর্ সুবাদার হইয়া ঢাকা নগরীতে রাজধানী করিলেন। ১৬৬১ অব্দে তিনি কোচবেহার জয় করেন; এবং পর বৎসর আসাম আক্রমণ করিয়া উহার রাজধানী হস্তগত করেন। কিন্তু বর্ষাকাল উপস্থিত হইলে, তাঁহার সৈন্যগণ পীড়িত হইতে লাগিল দেখিয়া তিনি প্রত্যাগমন করিতে বাধ্য হইলেন। ঢাকায় পৌঁছিয়া অল্পকাল পরেই তাঁহার মৃত্যু হয় (১৬৬৪ খৃঃ)।
মীর জুম্লার পরে নূর জাহানের ভ্রাতুষ্পুত্ত্র সায়েস্তা খাঁ বাঙ্গালার সুবাদার হন এবং সম্রাট্ অরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্ত্র সুলতান মহম্মদ আজিম বেহারের শাসনকর্ত্তৃপদে নিযুক্ত হইলেন। মধ্যে তিন বৎসর ব্যতীত সায়েস্তা খাঁ ১৬৬৪ হইতে ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা শাসন করিয়াছিলেন। তাঁহার সময়ে ফরাসিরা চন্দননগরে, (১৬৭৩ খৃঃ) এবং দিনেমার ও ওলন্দাজেরা চুঁচুড়ায় কুঠী স্থাপন করেন। আরাকানরাজ সুজার প্রতি অসদাচরণ করিয়া যথোপযুক্ত শাস্তি না পাওয়ায় সাহসী হইয়া মধ্যে মধ্যে বাঙ্গালার দক্ষিণ-পূর্ব্ব প্রদেশ লুণ্ঠন করিতেছিল; সায়েস্তা খাঁ আরাকান আক্রমণ করিয়া তথাকার রাজাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন এবং চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালাভুক্ত করিলেন।
সায়েস্তা খাঁ স্বেচ্ছায় বঙ্গসিংহাসন ত্যাগ করিলে, সম্রাট্ অরঙ্গজেবের অভিমতে ফিদাই খাঁ আজিম খাঁ উপাধিসহ ১৬৭৭ খৃষ্টাব্দে ঢাকায় উপনীত হন। পর বৎসর সেখানে তাহার মৃত্যু হইলে ১৬৭৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট অরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র সুলতান মহম্মদ আজিম বাঙ্গালার সুবাদার হন। তিনি উক্ত বর্ষের শেষকালে আসামীদিগের উপদ্রব দমনার্থ সেনাদল প্রেরণ করেন। ইংরাজ ও ওলন্দাজেরা এই সময়ে ঢাকায় কুঠী নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন।
যোধপুর-রাজকুমার রাজা যশোবন্ত সিংহের নাবালক পুত্রের রাজ্যাধিকার লইয়া সম্রাটের সহিত রাজপুতদিগের বিবাদের সূত্রপাত হয়, ঐ সময়ে দক্ষিণে শিবাজীর অধীনে মহারাষ্ট্রীয়গণ মোগলসম্রাটের অধীনতা অস্বীকার করে; এই গোলযোগে বিব্রত সম্রাট্ স্বীয় পুত্রকে বাঙ্গালা হইতে নিকটে আনাইয়া রাজপুত সামন্তগণের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তাঁহার আদেশে নবাব সায়েস্তা খাঁ আমীর উল্ওমরা বাঙ্গালার সুবাদার হইয়া আইসেন।
এবার সায়েস্তা খাঁর অত্যাচারের মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠে। তিনি জিজিয়া কর আদায়ের জন্য হিন্দুর মন্দিরাদি চূর্ণ বিচূর্ণ করিতে লাগিলেন। তিনি খৃষ্টানের নিকট হইতেও বলপূর্ব্বক জিজিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সময়ে মিঃ হেজেস্ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গবর্ণর নিযুক্ত হন। শুল্ক লইয়া