পাতা:মাধবীকঙ্কণ - রমেশচন্দ্র দত্ত.pdf/৭১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

তুমি কখনও দেখ নাই? সুদূরশ্রুত সঙ্গীতের ন্যায় স্মৃতিশক্তি নরেন্দ্রের মনে ক্রমে ক্রমে জাগরিত হইতে লাগিল। কাশীর যুদ্ধ, দিল্লী, দিল্লীতে একজন মুসলমান নারী—উঃ! এ সেই জেলেখা।

 নরেন্দ্রের চিন্তা করিবার অবসর ছিল না। সহসা সপ্তস্বরসমন্বিত অপ্সরাকণ্ঠ নিঃসৃত অপূর্ব গীত সেই পর্বতকন্দর আমোদিত করিল; নরেন্দ্রের হৃদয় আলোড়িত করিল। জেলেখা সেই বীণার সঙ্গে সঙ্গে গান সংযোজনা করিয়াছে। আহা! কী মধুর, কী হৃদয়গ্রাহী, কী ভাবপরিপূর্ণ। নরেন্দ্র একদৃষ্টিতে জেলেখার দিকে চাহিয়া রহিলেন, গাইতে গাইতে জেলেখার কণ্ঠ একবার রুদ্ধ হইল নয়ন দিয়া দুই এক বিন্দু জল গণ্ডস্থল বহিয়া পড়িতে লাগিল।

 নারীর ধর্ম কি? সতী কি সাধিতে পাবে?

 আজীবন প্রেমবারিদানে পতির প্রেমতৃষ্ণা নিবারণ করিতে পারে। সম্পদকালে প্রেমালোক জ্বালিয়া লক্ষ্মীরূপিণী পতির আনন্দবর্ধন করিতে পারে। রণের মাঝে বীর্যবতী প্রদীপ্ত আশারূপিণী হইয়া পতির হৃদয় বীররসে পরিপূর্ণ করিতে পারে। দুঃখঅন্ধকারে জীবনের আশা-প্রদীপ একে একে নির্বাণ হইয়া গেল। সমদুঃখিনী হইয়া স্বামীর ক্লেশ বিমোচন করিতে পারে। জীব-আকাশ হইতে জীবতারা যখন খসিয়া যায়, পতিব্রতা নারী উল্লাসে প্রিয়ের পার্শ্বে সহমৃতা হইতে পারে।

 এই মর্মেব সুন্দর গান সমাপ্ত হইল, কিন্তু নরেন্দ্রের কর্ণমূলে তখনও সে সঙ্গীত শেষ হইল না। একবার সুমধুর ধীরশব্দে, এক-একবার বজ্রনাদে তাঁহার কর্ণে সে গান এখনও শব্দিত হইতে লাগিল। জেলেখা মানবী কি পরীকন্যা। যেই হউক, নরেন্দ্র তাহার মুখমণ্ডল বার বার নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। বোধ হইল, যেন পূর্বে যে রূপ দেখিয়াছিলেন, এখন জেলেখা তাহা অপেক্ষা উজ্জ্বলতর সৌন্দর্য ধারণ করিয়াছে। তথাপি শোকের পাণ্ডুবর্ণ ললাট ন্যস্ত করিয়াছে, বাহু ও অঙ্গুলি অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ, নয়নদ্বয়ে যেন দুঃখ নিবাস করিতেছে। নরেন্দ্র আর দেখিবার সময় পাইলেন না, আবার অপূর্ব সঙ্গীতধ্বনি পর্বতকন্দর কাঁপাইতে লাগিল, আবার দুঃখের গানে নরেন্দ্রের হৃদয় আলেড়িত ও দ্রবীভূত হইল।

 পতির নিকট পতিব্রতা নারী কি ভিক্ষা চাহে? প্রেম-ভিক্ষা ভিন্ন এ জগতে দাসীর আর কি ভিক্ষা আছে? প্রেম-লতিকার বেশে তোমার পদযুগল ধরিয়াছে, স্নেহকণা দিয়া সজীব করিও যেন ধরণী না লুটায়। জাতি, বন্ধু, দেশ দূরে রাখিয়া তোমার নিকট আসিয়াছে, যেন তোমার সুখে সুখিনী হয়, তোমার দুঃখে দুঃখিনী হয়, তোমার পদচ্ছায়া যেন পায়। যতদিন প্রাণ থাকে, ইহা ভিন্ন অন্য ভিক্ষা নাই, আয়ু শেষ হইলে

৭১