পাতা:মানিক গ্রন্থাবলী.pdf/১০২

উইকিসংকলন থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
মাণিক গ্রন্থাবলী

কেন? যাদের মোটর নাই, ছেলে কি তাদের স্কুলে যায় না? সহসা উদ্ধত আত্মসম্মান-জ্ঞানে শ্যামার হৃদয় ভরিয়া গেল। না, শঙ্করের সঙ্গে গাড়িতে তাহার ছেলেকে স্কুলে যাইতে দেওয়ার জন্য বিষ্ণুপ্রিয়ার তোষামোদ সে করিবে না।

 পরদিন মামার সঙ্গে ছেলেকে সে স্কুলে পাঠাইয়া দিল। বলিল, এ মাসের ক’টা দিন মোটে বাকি আছে, এ ক’টা দিন ট্রামে নগদ টিকিট কিনে ওকে স্কুলে দিয়ে এসো, নিয়ে এসো মামা, এ ক'দিন তোমার সঙ্গে এলে গেলে তারপর ও নিজেই যাতায়াত করতে পারবে, মাস কাবারে কিনে দেব একটা মাসিক টিকিট।

 বিধান অবজ্ঞার সুরে বলিল — মা তুমি খালি ভাব। আমার চেয়ে কত ছোট ছেলে একলা ট্রামে চেপে স্কুলে যায়। আমি যেখানে খুশি যেতে পারি মা,— যাই নি ভাবছ? ট্রামে কদ্দিন গেছি চিড়িয়াখানায় চলে।

 শ্যামা স্তম্ভিত হইয়া বলিল — স্কুল পালিয়ে একলাটি তুই চিড়িয়াখানায় যাস খোকা!

 বিধান বলিল — রোজ নাকি? একদিন দুদিন গেছি মোটে — স্কুল পালাই নি তো। প্রথম ঘণ্টা ক্লাশ হয়ে কদ্দিন আমাদের ছুটি হয়ে যায়, ক্লাশের একটা ছেলে মরে গেলে আমরা বুঝি স্কুল করি? এমনি হৈ-চৈ করি যে, হেডমাষ্টার ছুটি দিয়ে দেয়।



প্রথম প্রথম শীতলের জন্য বকুল কাঁদিত। দোতলার ঘরখানা শ্যামা তাহাদের শয়নকক্ষ করিয়াছে, দামী জিনিসপত্রের বাক্স প্যাঁটরা, বাড়তি বাসনকোসনও ওই ঘরে থাকে, সকালে বিকালে ও ঘরে কেহ থাকে না, শুধু বকুল আপন মনে পুতুল খেলা করে। পুতুল খেলিতে খেলিতে বাবার জন্য নিঃশব্দে সে কাঁদিত, মনের মানুষকে না দেখাইয়া অতটুকু মেয়ের গোপন কান্না স্বাভাবিক নয়, কি মন বকুলের কে জানে। কোনো কাজে উপরে গিয়া শ্যামা দেখিত মুখ বাঁকাইয়া চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে বকুল তাহার পুতুল-পরিবারটিকে খাওয়াইতে বসাইয়াছে। মেয়ে কার জন্য কাঁদে, শ্যামা বুঝিতে পারিত, এ বাড়িতে সেই জেলের কয়েদীটোকে ও ছাড়া আর তো কেহ কোনোদিন ভালবাসে নাই। মেয়েকে ভুলাইতে

১০৮