পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


«w . রবীন্দ্র-রচনাবলী তাহার অস্তিত্বের বিষয়েই সন্দেহ উপস্থিত হইল, তখন হয়ত সেদিনকার একটি চিঠির একটুখানি ছেড়া টুকরা অথবা দেয়ালের উপর বহুদিনকার পুরাণ একটি পেন্সিলের দাগ দেখিবামাত্র সে যেন তৎক্ষণাৎ সশরীরে বিদ্যুতের মত আমার সমুখে আসিয়া উপস্থিত হয়! ঐ কাগজের টুকরাটি, পেন্সিলের দাগটি তাহাকে যেন যাদু করিয়া রাখিয়াছিল ; তোমার চারি দিকে আরও ত কত শত জিনিষ আছে, কিন্তু সেই অতীত ঘটনার পক্ষে ঐ ছেড়া কাগজটুকু ও সেই পেন্সিলের দাগটুকু ছাড়া আর সকলগুলিই non-conductor । অর্থাৎ আমরা এমনি ভয়ানক প্রত্যক্ষবাদী, যে, বৰ্ত্তমানের গায়ের উপর অতীতের একটা স্পষ্ট চিহ্ন থাকা চাই, তবেই তাহার সহিত আমাদের ভালরূপ আদান প্রদান চলিতে পারে । যাহার অতীত-জীবন বহুবিধ কাৰ্য্যভার বহন করিয়া ধনবান বণিকের মত সময়ের পথ দিয়া চলিয়া গিয়াছিল, সে নিশ্চয়ই পথ চলিতে চলিতে একটা-না-একটা টুকরা ফেলিতে ফেলিতে গিয়াছিল, সেইগুলি ধরিয়া ধরিয়া অনায়াসেই সে তাহার অতীতের পথ খুজিয়া লইতে পারে। আর আমাদের মত যাহার অলস অতীত রিক্তহস্তে পথ চলিতেছিল, সে আর কি চিহ্ন রাথিয়া যাইবে । স্বতরাং তাহাকে আর খুজিয়া পাইবার সম্ভাবনা নাই, সে একেবারে হারাইয়া গেল ! ইতিহাস সম্বন্ধেও এইরূপ বলা যায় । বৰ্ত্তমানের গায়ে অতীত কালের একটা নামসই থাকা নিতান্তই আবশ্যক। কালিদাস যে এক সময়ে বর্তমান ছিলেন, তাহা আমি অস্বীকার করি না, কিন্তু আজ যদি আমি দৈবাৎ তাহার স্বহস্তে লিখিত মেঘদূত পুথিখানি পাই, তবে তাহার অস্তিত্ব আমার পক্ষে কিরূপ জাজ্জ্বল্যমান হইয়া উঠে ! আমরা কল্পনায় যেন তাহার স্পর্শ পৰ্য্যস্ত অনুভব করিতে পারি। ইহা হইতে তীর্থযাত্রার একটি প্রধান ফল অনুমান করা যায়। আমি একজন বুদ্ধের ভক্ত। বুদ্ধের অস্তিত্বের বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই । কিন্তু যখন আমি সেই তীর্থে যাই, যেখানে বুদ্ধের দস্ত রক্ষিত আছে, সেই শিলা দেখি যাহার উপর বুদ্ধের পদচিহ্ন অঙ্কিত আছে, তখন আমি বুদ্ধকে কতখানি প্রাপ্ত হই! যখন দেখি, ফুটন্ত, ছুটন্ত বৰ্ত্তমান স্রোতের উপর পুরাতন কালের একটি প্রাচীন জীর্ণ অবশেষ নিশ্চলভাবে বসিয়া তাহার অমরতার অভিশাপের জন্য শোক করিতেছে, অতীতের দিকে অনিমেষনেত্রে চাহিয়া আছে, অতীতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিতেছে, তখন এমন হৃদয়হীন পাষাণ কে আছে যে মুহূৰ্ত্তের জন্য থামিয়া একবার পশ্চাৎ ফিরিয়া সেই মহা অতীতের দিকে চাহিয়া না দেখে ! 临 কিছুই ত থাকে না, সবই ত চলিয়া যায়, তথাপি এই যে দুটি একটি চিহ্ন অতীত রাখিয়া গিয়াছে; ইহাও মুছিয়া ফেলিতে চায়, এমন কে আছে ? সময়ের অরণ্য অসীম ।