পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী 89.3 আলোতে, গুহাগহার-অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় । দুই পায়ের উপর খাড়া-দাড়ানো ছোটো ছোটো চটুল জীব, লাফ দিয়ে চড়ে চড়ে বসল মহাকায় বিপদবিভীষিকার পিঠের উপর, বিষ্ণু যেমন চড়েছেন গরুড়ের পিঠে। অসাধ্যের সাধনায় চলল তারা জীর্ণ যুগান্তরের ভগ্নাংশবিকীর্ণ দুর্গম পথে। তারই সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীকে ঘিরে ঘিরে বরুণের মৃদঙ্গ বাজতে লাগল দিনে রাত্রে, তরঙ্গে তরঙ্গে। আজ তাই শুনছি আর এমন-কোনো একটা কথা ছন্দে আবৃত্তি করতে ইচ্ছা করছে বা অনাদিকালের। আজকের দিনের মতোই এইরকম আলো-ঝলমলানো কলকল্পোলিত নীলজলের দিকে তাকিয়ে ইংরেজ কবি শেলি একটি কবিতা লিখেছেন— 南 The sun is warm, the sky is clear, The waves are dancing fast and bright. কিন্তু, এ তার ক্লাস্ত জীবনের অবসাদের বিলাপ। এর সঙ্গে আজ ভিতরে বাইরে মিল পাচ্ছি নে। একটা জগৎজোড়া কলক্ৰন্দন শুনতে পাচ্ছি বটে, সেই ক্ৰন্দন ভরিয়ে তুলছে আস্তরীক্ষকে, যে-অস্তরীক্ষের উপর বিশ্বরচনার ভূমিকা, যে-অস্তরীক্ষকে বৈদিক ভারত নাম দিয়েছে ক্ৰন্দলী । এ কিন্তু প্রাস্তিভারাতুর পরাভবের ক্ৰন্দন নয়। এ নবজাত শিশুর ক্ৰন্দন, ষে-শিশু উর্ধ্বস্বরে বিশ্বদ্বারে আপন অস্তিত্ব ঘোষণা ক’রে তার প্রথমক্রন্দিত নিশ্বাসেই জানায়, “অয়মহং ভোঃ ।” অসীম ভাবীকালের স্বারে সে অতিথি । অস্তিত্বের ঘোষণায় একটা বিপুল কান্না আছে। কেননা, বারে বারে তাকে ছিন্ন করতে হয় আবরণ, চূর্ণ করতে হয় বাধা । অস্তিত্বের অধিকার পড়ে-পাওয়া জিনিস নয়, প্রতি মুহূর্তেই সেটা লড়াই-করে-নেওয়া জিনিস। তাই তার কান্না এত তীব্র, আর জীবলোকে সকলের চেয়ে তীব্র মানবসত্তার নবজীবনের কান্না । সে যেন অন্ধকারের গর্ত বিদারণকরা নবজাত আলোকের ক্ৰন্দনধ্বনি। তারই সঙ্গে সঙ্গে নব নব জন্মে নব নব যুগে দেবলোকে বাজে মঙ্গলশঙ্খ, উচ্চারিত হয় বিশ্বপিতামহের অভিনন্দনমন্ত্র। ři আজকের দিনে এই আমার শেষ উপলব্ধি নয়। সকালে দেখলুম, সমুদ্রের প্রাস্তরেখায় আকাশ তার জ্যোতির্ময়ী চিরন্তনী বাণীটি লিখে দিলে ; সেটি পরম শাস্তির বাণী, তা মর্তলোকের বহু যুগের বহু দুঃখের আর্তকোলাহলের আবর্তকে ছাড়িয়ে ওঠে, যেন অশ্রীর ঢেউয়ের উপরে শ্বেতপদ্মের মতো। তার পরে নিশেষের দিকে দেখলুমএকটি অখ্যাত ব্যক্তিকে, যার মধ্যে মহন্যত্ব অপমানিত— যদি সময় পাই তার কথা পরে বলব। তখন মানব-ইতিহাসের দিগন্তে দিগন্তে দেখতে পেলুম বিরোধের কালো মেঘ, অশাস্তির প্রচ্ছন্ন বন্ধগর্জন, আর লোকালয়ের উপর রূত্রের ভ্ৰকুটিচ্ছায়া । ইতি ২ শ্রাবণ ১৩৩৪ ॥১ ১ খ্ৰীমতী নির্মলকুমাৰী মহলানৰীশৰে লিখিত।