পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৪৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


९९० রবীন্দ্র-রচনাবলী সমক্ষে আমি আমার নাটকখানি পাঠ করিলাম এবং বামাচরণবাৰু তাহার সমালোচনা করিলেন। সে সমালোচনাটি বিস্তারিত আকারে লিপিবদ্ধ করিবার প্রবৃত্তি আমার নাই। সংক্ষেপত, সমালোচনাটি আমার অমুকুল হয় নাই ; বামাচরণবাবুর মতে নাটকগত পাত্ৰগণের চরিত্র ও মনোভাব-সকল নির্দিষ্ট বিশেষত্ব প্রাপ্ত হয় নাই। বড়ো বড়ো সাধারণ ভাবের কথা আছে, কিন্তু তাহা বাষ্পবৎ অনিশ্চিত, লেখকের অস্তরের মধ্যে আকার ও জীবন প্রাপ্ত হইয়া তাহা স্বজিত হইয় উঠে নাই। বৃশ্চিকের পুচ্ছদেশেই হুল থাকে, বামাচরণবাবুর সমালোচনার উপসংহারেই তীব্রতম বিষ সঞ্চিত ছিল । আসন গ্রহণ করিবার পূর্বে তিনি বলিলেন, আমার এই নাটকের অনেকগুলি দৃশু এবং মূলভাবটি গেটে-রচিত টাসো নাটকের অনুকরণ, এমন কি অনেকস্থলে অনুবাদ । এ কথার সদুত্তর ছিল । আমি বলিতে পারিতাম, হউক অনুকরণ, কিন্তু সেটা নিন্দার বিষয় নহে! সাহিত্যরাজ্যে চুরিবিদ্যা বড়ো বিষ্ঠা, এমন-কি, ধরা পড়িলেও । সাহিত্যের বড়ো বড়ো মহাজনগণ এই কাজ করিয়া আসিয়াছেন, এমন-কি, সেক্সপিয়রও বাদ যান না। সাহিত্যে যাহার অরিজিন্তালিটি অত্যন্ত অধিক সেই চুরি করিতে সাহস করে, কারণ, সে পরের জিনিসকে সম্পূর্ণ আপনার করিতে পারে। ভালো ভালো এইরূপ আরো অনেক কথা ছিল, কিন্তু সেদিন বলা হয় নাই। বিনয় তাহার কারণ নহে। আসল কথা, সেদিন একটি কথাও মনে পড়ে নাই। প্রায় পাঁচ-সাতদিন পরে একে একে উত্তরগুলি দৈবাগত ব্ৰহ্মান্ত্রের স্তায় আমার মনে উদয় হইতে লাগিল ; কিন্তু শত্রুপক্ষ সম্মুখে উপস্থিত না থাকাতে সে অস্ত্রগুলি আমাকেই বিধিয়া মারিল । ভাবিতাম, এ কথাগুলো অন্তত আমার ক্লাসের ছাত্রদিগকে শুনাইয়া দিব। কিন্তু উত্তরগুলি আমার সহাধ্যায়ী গর্দভদিগের বুদ্ধির পক্ষে কিছু অতিমাত্র স্বল্প ছিল ! তাহারা জানিত, চুরিমাত্রেই চুরি ; আমার চুরি এবং অন্তের চুরিতে যে কতটা প্রভেদ আছে তাহা বুঝিবার সামর্থ্য যদি তাহাদের থাকিত তবে আমার সহিতও তাহাদের বিশেষ প্রভেদ থাকিত না । বি. এ. পরীক্ষা দিলাম, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিব তাহাতেও আমার সন্দেহ ছিল না ; কিন্তু মনে আনন্দ রছিল না। বামাচরণের সেই গুটিকতক কথার আঘাতে আমার সমস্ত খ্যাতি ও আশার অভ্ৰভেদী মন্দির ভগ্নস্তৃপ হইয়া পড়িল। কেবল আমার প্রতি অবোধ অমূল্যের শ্রদ্ধা কিছুতেই হ্রাস হইল না ; প্রভাতে যখন যশঃস্থধ আমার সম্মুখে উদিত ছিল তখনো সেই শ্রদ্ধা অতি দীর্ঘ ছায়ার স্তায় আমার পাতললগ্ন হইয়া