পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


OS8 রবীন্দ্র-রচনাবলী উচ্চারণে জ-এর অ এবং ট-এর আ আমরা দীর্ঘ করে টেনে পরবর্তী হসন্তের ক্ষতিপূরণ করে থাকি। জল এবং জলা, চাদ এবং চাদা শব্দের তুলনা করলে এ কথা ধরা পড়বে। এ সম্বন্ধে বাংলার বিখ্যাত ধ্বনিতত্ত্ববিৎ স্বনীতিকুমারের বিধান নিলে নিশ্চয়ই তিনি আমার সমর্থন করবেন। বাংলায় ধ্বনির এই নিয়ম স্বাভাবিক বলেই আধুনিক বাঙালি কবি ও ততোধিক আধুনিক বাঙালি ছন্দোবিং জন্মাবার বহু পূর্বেই বাংলা ছন্দে প্রাকৃহসন্ত স্বরকে দুই মাত্রার পদবি দেওয়া হয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালির কানে ঠেকে নি ; এই প্রথম দেখা গেল, নিয়মের ধাধায় পড়ে বাঙালি পাঠক কানকে অবিশ্বাস করলেন। কবিতা লেখা শুরু করবার বহুপূর্বে সবে যখন দাত উঠেছে তখন পড়েছি, "জল পড়ে, পাতা নড়ে।” এখানে 'জল' যে ‘পাতা’র চেয়ে মাত্রাকোলীন্যে কোনো অংশে কম, এমন সংশয় কোনো বাঙালি শিশু বা তার পিতামাতার কানে বা মনেও উদয় হয় নি। এইজন্যে ওই দুটো কথা অনায়ালে এক পঙক্তিতে বসে গেছে, আইনের ঠেলা খায় নি। ইংরেজি মতে 'জল' সর্বত্রই এক সিলেবল, ‘পাতা তার ' ডবল ভারী । কিন্তু জল শব্দটা ইংরেজি নয় । ‘কাশীরাম’ নামের ‘কাশী’ এবং ‘রাম’ ষে একই ওজনের এ কথাটা কাশীরামের স্বজাতীয় সকলকেই মানতেই হয়েছে। ‘উদয়দিগন্তে ঐ শুভ্র শঙ্খ বাজে এই লাইনটা নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রবোধচন্দ্র ছাড়া আর কোনো পাঠকের কিছুমাত্র খটকা লেগেছে বলে আমি জানি নে, কেননা তারা সবাই কান পেতে পড়েছে, নিয়ম পেতে নয়। যদি কর্তব্যবোধে নিতান্তই খটকা লাগা উচিত হয়, তা হলে সমস্ত বাংলাকাব্যের পনেরো-আনা লাইনের এখনই প্রফ সংশোধন করতে বসতে হবে । লেখক আমার একটা মস্ত ফাকি ধরেছেন । তিনি বলেন, আমি ইচ্ছামত কোথাও ঐ লিখি, কোথাও লিখি ওই’, এই উপায়ে পাঠকের চোখ ভুলিয়ে অক্ষরের বাটখারার চাতুরীতে একই উচ্চারণকে জায়গা বুঝে দুইরকমের মূল্য দিয়েছি। তা হলে গোড়াকার ইতিহাসটা বলি। তখনকার দিনে বাংলা কবিতায় এক-একটি অক্ষর এক সিলেবল বলেই চলত। অথচ সে দিন কোনো কোনো ছন্দে যুগ্মধ্বনিকে দ্বৈমাত্রিক বলে গণ্য করার দরকার আছে বলে অনুভব করেছিলুম। আকাশের ওই আলোর কাপন নয়নেতে এই লাগে, সেই মিললের তড়িৎ-তাপন নিখিলের রূপে জাগে ।