পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্দশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Հ8ե রবীন্দ্র-রচনাবলী আমার শৈবালগুন্মগুলি যেন পুলকিত হইয়া উঠিত। কুসুম ষে খুব বেশি খেলা করিত বা গল্প করিত, বা হাসিতামাশা করিত তাহা নহে, তথাপি আশ্চর্ষ এই, তাহার যত সজিনী এমন আর কাহারও নয়। যত দুরন্ত মেয়েদের তাহাকে না হইলে চলিত না । কেহ তাহাকে বলিত কুলি, কেহ তাহাকে বলিত খুশি, কেহ তাহাকে বলিত রাঙ্কুলি । তাহার মা তাহাকে বলিত কুস্মি । যখন তখন দেখিতাম কুস্থম জলের ধারে বসিয়া আছে । জলের সঙ্গে তাহার হৃদয়ের সঙ্গে বিশেষ যেন কী মিল ছিল। সে জল ভারি ভালোবাসিত । কিছুদিন পরে কুস্কমকে আর দেখিতে পাই না । ভুবন আর স্বর্ণ ঘাটে আসিয়া কাদিত । শুনিলাম তাহাদের কুসি-খুশি-রাকুলিকে শ্বশুরবাড়ি লইয়া গিয়াছে। শুনিলাম, যেখানে তাহাকে লইয়া গেছে, সেখানে নাকি গঙ্গা নাই । সেখানে আবার কারা সব নূতন লোক, নূতন ঘরবাড়ি, নূতন পথঘাট। জলের পদ্মটিকে কে যেন ডাঙায় রোপণ করিতে লইয়া গেল । ক্রমে কুস্কমের কথা একরকম ভুলিয়া গেছি। এক বৎসর হইয়া গেছে। ঘাটের মেয়েরা কুসুমের গল্পও বড়ো করে না । একদিন সন্ধ্যার সময়ে বহুকালের পরিচিত পায়ের স্পর্শে সহসা যেন চমক লাগিল। মনে হইল যেন কুসুমের পা। তাহাই বটে, কিন্তু সে পায়ে আর মল বাজিতেছে না। সে পায়ের সে সংগীত নাই । কুস্কমের পায়ের স্পর্শ ও মলের শব্দ চিরকাল একত্র অনুভব করিয়া আসিতেছি—আজ সহসা সেই মলের শব্দটি না শুনিতে পাইয়া সন্ধ্যাবেলাকার জলের কল্লোল কেমন বিষন্ন শুনাইতে লাগিল, আম্রবনের মধ্যে পাতা ঝরঝর করিয়া বাতাস কেমন হা হা করিয়া উঠিল । কুসুম বিধবা হইয়াছে। শুনিলাম তাহার স্বামী বিদেশে চাকরি করিত ; দুই-একদিন ছাড়া স্বামীর সহিত সাক্ষাৎই হয় নাই। পত্ৰযোগে বৈধব্যের সংবাদ পাইয়া আট বৎসর বয়সে মাথার সিদুর মুছিয়া গায়ের গহনা ফেলিয়া আবার তাহার দেশে সেই গঙ্গার ধারে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু, তাহার সন্ধিনীদেরও বড়ো কেহ নাই। ভূবন স্বর্ণ অমলা শ্বশুরঘর করিতে গিয়াছে। কেবল শরৎ আছে, কিন্তু শুনিতেছি অগ্রহায়ণ মাসে তাহারও বিবাহ হইয়া যাইবে । কুস্কম নিতান্ত একলা পড়িয়াছে। কিন্তু, সে যখন দুটি হাটুর উপর মাথা রাখিয়া চুপ করিয়া আমার ধাপে বসিয়া থাকিত, তখন আমার মনে হইত যেন নদীর ঢেউগুলি সবাই মিলিয়া হাত তুলিয়া তাহাকে কুসি-খুশি রাঙ্কুসি বলিয়া ডাকাডাকি করিত। .# r বর্ষার আরম্ভে গন্ধ যেমন প্রতিদিন দেখিতে দেখিতে ভরিয়া উঠে, কুহুম তেমনি দেখিতে দেখিতে প্রতিদিন সৌন্দর্ষে যৌবনে ভরিয়া উঠিতে লাগিল। কিন্তু তাহার মলিন