পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্দশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৮৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন סרס জগতের সঙ্গে একেবারে অচ্ছেষ্ঠ ভাবে জড়িত নয় তার যে একটি স্বকীয় প্রতিষ্ঠা ৷ আছে মৃত্যুর শিক্ষায় এই কথাটা যেন অনুভব করতে পারলুম। 廳 ধার মৃত্যু হল তিনি ভোগী ছিলেন এবং তার ঐশ্বর্ষের অভাব ছিল না। তার সেই ভোগের জীবন ভোগের আয়োজন —যা কেবল তার কাছে নয়, সর্বসাধারণের কাছে অত্যন্ত সভ্য বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, যা স্বতপ্রকার সাজে সজায় জাকেজমকে লোকের চক্ষুকৰ্ণকে ঈর্ষা ও লুন্ধতায় আকৃষ্ট করে আকাশে মাথা তুলেছিল তা একটি মুহূর্তেই শ্মশানের ভস্মমুষ্টির মধ্যে অনাদরে বিলুপ্ত হয়ে গেল । সংসার যে এতই মিথ্যা, তা যে কেবল স্বপ্ন কেবল মরীচিকা, নিশ্চিত মৃত্যুকে স্বরণ করে শাস্ত্র সেই কথা চিন্তা করবার জন্তে বারবার উপদেশ করেছেন। নতুবা আমরা কিছুই ত্যাগ করতে পারি নে এবং ভোগের বন্ধনে জড়িত থেকে আত্মা নিজের বিশুদ্ধ মুক্তস্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না । কিন্তু সংসারকে মিথ্যা মরীচিকা বলে ত্যাগকে সহজ করে তোলার মধ্যে সত্যও নেই গৌরবও নেই। যে দেশে আমাদের টাকা চলে না সেই দেশে এখানকার টাকার বোঝাটাকে জঞ্জালের মতো মাটিতে ফেলে দেওয়ার মধ্যে ঔদার্ধ কিছুই নেই। কোনোপ্রকারে সংসারকে যদি একেবারেই অলীক বলে নিজের কাছে যথার্থই সংপ্ৰমাণ করতে পারি তাহলে ধনজনমান তো মন থেকে খসে পড়ে একেবারেই শূন্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু সেরকম ছেড়ে দেওয়া ফেলে দেওয়া নিতান্তই একটা রিক্ততা মাত্র । সে যেন স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মতো—যা ছিল না তাকেই চমকে উঠে নেই বলে জানা । বস্তুত সংসার তো মিথ্যা নয়, জোর করে তাকে মিথ্যা বলে লাভ কী । যিনি গেলেন তিনি গেলেন বটে কিন্তু সংসারে তো ক্ষতির কোনো লক্ষণই দেখি নে। সূর্যালোকে তো কোনো কালিমা পড়ে নি—আকাশের নীল নির্মলতায় মৃত্যুর চাকা তো ক্ষতির একটি রেখাও কাটতে পারে নি ; অফুরান সংসারের ধারা আজও পূর্ণবেগেই চলেছে । তবে অসত্য কোনটা ? এই সংসারকে আমার বলে জানা। এর একটি স্বচ্যগ্র বিন্দুকেও আমার বলে আমি ধরে রাখতে পারব না। যে ব্যক্তি চিরজীবন কেবল ওই আমার উপরেই সমস্ত জিনিসের প্রতিষ্ঠা করতে চায় সেই বালির উপর ঘর বাধে । মৃত্যু যখন ঠেলা দেয় তখন সমস্তই ধুলায় পড়ে ধূলিসাৎ হয়। আমি বলে ৰে কাণ্ডালটা সব জিনিসকেই গালের মধ্যে দিতে চায়, সব জিনিসকেই মুঠোর মধ্যে পেতে চায়, মৃত্যু কেবল তাকেই ফাকি দেয়—তখন সে মনের খেদে সমস্ত সারকেই ফাকি বলে গাল দিতে থাকে, কিন্তু সংসার যেমন তেমনিই থেকে যায়, মৃত্যু তার গায়ে আঁচড়টি কাটতে পারে না।