পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্বিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


R>や রবীন্দ্র-রচনাবলী কেবল একটা জায়গায় আমাদের মধ্যে যে-অসামঞ্জস্ত ঘটেছে তার আর মিটমাট হতে পারল না । কলিকার বিশ্বাস, আমি স্বদেশকে ভালোবাসি নে। নিজের বিশ্বাসের উপর তার বিশ্বাস অটল— তাই আমার আস্তরিক দেশ-ভালোবাসার যতই প্রমাণ দিয়েছি, তাদের নির্দিষ্ট বাহ লক্ষণের সঙ্গে মেলে না বলে কিছুতেই তাকে দেশভালোবাসা বলে স্বীকার করাতে পারি নে। ছেলেবেলা থেকে আমি গ্রন্থবিলাসী, নতুন বইয়ের খবর পেলেই কিনে আনি। আমার শত্রুরাও কবুল করবে যে, সে বই পড়েও থাকি ; বন্ধুরা খুবই জানেন যে, পড়ে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেও ছাড়ি নে — সেই আলোচনার চোটে বন্ধুরা পাশ কাটিয়ে চলাতে অবশেষে একটিমাত্র মানুষে এসে ঠেকেছে, বনবিহারী, যাকে নিয়ে আমি রবিবারে আসর জমাই । আমি তার নাম দিয়েছি কোণবিহারী । ছাদে বসে তার সঙ্গে আলাপ করতে করতে এক-একদিন রাত্তির দুটো হয়ে যায়। আমরা যখন এই নেশায় ভোর তখন আমাদের পক্ষে সুদিন ছিল না । তখনকার পুলিস কারও বাড়িতে গীতা দেখলেই সিডিশনের প্রমাণ পেত। তখনকার দেশভক্ত যদি দেখত কারও ঘরে বিলিতি বইয়ের পাত কাটা, তবে তাকে জানত দেশবিদ্রোহী। আমাকে ওরা শু্যামবর্ণের প্রলেপ দেওয়া শ্বেত-দ্বৈপায়ন বলেই গণ্য করত । সরস্বতীর বর্ণ সাদা বলেই সেদিন দেশভক্তদের কাছ থেকে তার পূজা মেলা শক্ত হয়েছিল। যে-সরোবরে র্তার শ্বেতপদ্ম ফোটে সেই সরোবরের জলে দেশের কপাল-পোড়ানো আগুন নেবে না, বরঞ্চ বাড়ে, এমনি একটা রব উঠেছিল। সহধর্মিণীর সদৃষ্টান্ত ও নিরস্তর তাগিদ সত্বেও আমি খন্দর পরি নে ; তার কারণ এ নয় যে, খন্দরে কোনো দোষ আছে বা গুণ নেই বা বেশভূষায় আমি শৌখিন। একেবারে উলটো – স্বাদেশিক চালচলনের বিরুদ্ধে অনেক অপরাধ আমার আছে, কিন্তু পরিচ্ছন্নতা তার অন্তর্গত নয়। ময়লা মোট রকমের সাজ, আলুখালু রকমে ব্যবহার করাটাই আমার অভ্যাস। কলিকার ভাবাস্তর ঘটবার পূর্ববর্তী যুগে চীনেবাজারের আগ-চওড়া জুতো পরতুম, সে জুতোয় প্রতিদিন কালিমা-লেপন করিয়ে নিতে ভুলতুম, মোজা পরতে আপদ বোধ হত, শার্ট না পরে পাঞ্জাবি পরতে আরাম পেতুম, আর সেই পাঞ্জাবিতে দুটো-একটা বোতামের অভাব ঘটলেও খেয়াল করতুম না— ইত্যাদি কারণে কলিকার সঙ্গে আমার সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ হবার আশঙ্কা ঘটেছিল। সে বলত, “দেখো, তোমার সঙ্গে কোথাও বেরতে আমার লজ্জা করে ।” আমি বলতুম, “আমার অনুগত হবার দরকার নেই, আমাকে বাদ দিয়েই তুমি বেরিয়ো ।” o