পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্বিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ । ९९ॐ ছেলেটার বুক কেঁপে উঠল, মুখ হল ফ্যাকাশে। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, পরীক্ষায় চুনিলালের ইতিহাসে তারিখ ভুল হচ্ছে তার কারণটা কোথায়। ইতিমধ্যে চুনিলাল ছবিটাকে তার জামার মধ্যে লুকোবার ব্যর্থ প্রয়াস করাতে অপরাধ আরও প্রকাশমান হয়ে উঠল। টেনে নিয়ে গোবিন্দ যা দেখলেন তাতে তিনি আরও অবাক— এটা ব্যাপারখানা কী। এর চেয়ে যে ইতিহাসের তারিখ ভুলও ভালো। ছবিটা কুটিকুটি করে ছিড়ে ফেললেন। চুনিলাল ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। । সত্যবতী একাদশীর দিন প্রায় ঠাকুরঘরেই কাটাতেন। সেইখান থেকে ছেলের কান্না শুনে ছুটে এলেন। ছবির ছিন্ন খণ্ডগুলো মেঝের উপর লুটোচ্ছে আর মেঝের উপর লুটোচ্ছে চুনিলাল। গোবিন্দ তখন ইতিহাসের তারিখ-ভুলের আদি কারণগুলো সংগ্রহ করছিলেন অপসারণের অভিপ্রায়ে । সত্যবতী এতদিন কখনো গোবিন্দর কোনো ব্যবহারে কোনো কথা বলেন নি । এরই পরে তার স্বামী নির্ভর স্থাপন করেছেন, এই স্মরণ করেই তিনি নিঃশব্দে সব সহ করেছেন। আজ তিনি অশ্রুতে আর্দ্র, ক্রোধে কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “কেন তুমি চুনির ছবি ছিড়ে ফেললে।” গোবিন্দ বললেন, “পড়াশুনো করবে না ? আখেরে ওর হবে কী ।” সত্যবতী বললেন, “আখেরে ও যদি পথের ভিক্ষুক হয় সেও ভালো। কিন্তু, কোনোদিন তোমার মতো যেন না হয় । ভগবান ওকে যে-সম্পদ দিয়েছেন তারই গৌরব যেন তোমার পয়সার গর্বের চেয়ে বেশি হয়, এই ওর প্রতি আমার, মায়ের আশীৰ্বাদ ।” গোবিন্দ বললেন, “আমার দায়িত্ব আমি ছাড়তে পারব না, এ চলবে না কিছুতেই। আমি কালই ওকে বোর্ডিঞ্জ-স্কুলে পাঠিয়ে দেব— নইলে তুমি ওর সর্বনাশ করবে।” বড়োবাবু আপিসে গেলেন। ঘনবৃষ্টি নামল, রাস্ত জলে ভেসে যাচ্ছে। সত্যবতী চুনির হাত ধরে বললেন, “চল, বাবা।” চুনি বললে, “কোথায় যাবে, মা ।” “এখান থেকে বেরিয়ে যাই ।” রঙ্গলালের দরজায় একইাটু জল। সত্যবতী চুনিলালকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকলেন ; বললেন, “বাবা, তুমি নাও এর ভার। বাচাও একে পয়সার সাধনা থেকে।” কার্তিক, ১৩৩৬