পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৪৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


838 রবীন্দ্র-রচনাবলী পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে চলিতে বলিতে লাগিলেন, “মহিন, ঘাসনে মহিন, ফিরিয়া আয়, আমার একটা কথা শুনিয়া যা ।” মহেন্দ্র এক নিশ্বাসে ছুটিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল। মুহূত পরেই ফিরিয়া আসিয়া দরোয়ানকে জিজ্ঞাসা করিল, "বহুঠাকুরানী কোথায় গিয়াছেন।” দরোয়ান কহিল, “আমাদের বলিয়া যান নাই, আমরা কিছুই জানি না।” মহেন্দ্র গর্জিত ভৎসনার স্বরে কহিল, “জান না ।” দরোয়ান করজোড়ে কহিল, “না মহারাজ, জানি না ।” মহেন্দ্র মনে মনে স্থির করিল, “মা ইহাদের শিখাইয়া দিয়াছেন।” কহিল, "আচ্ছা, তা হউক ৷” মহানগরীর রাজপথে গ্যাসালোকবিদ্ধ সন্ধ্যান্ধকারে বরফওয়ালা তখন বরফ ও তপসিমাছওয়ালা তপসিমাছ ইকিতেছিল । কলরবক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে মহেন্দ্র প্রবেশ করিল এবং অদৃশু হইয়া গেল । NOV বিহারী একলা নিজেকে লইয়া অন্ধকার রাত্রে কখনো ধ্যান করিতে বসে না । কোনোকালেই বিহারী নিজের কাছে নিজেকে আলোচ্য বিষয় করে নাই । সে পড়াশুনা কাজকর্ম বন্ধুবান্ধব লোকজন লইয়াই থাকিত। চারিদিকের সংসারকেই সে নিজের চেয়ে প্রাধান্ত দিয়া আনন্দে ছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন প্রবল আঘাতে তাহার চারিদিক যেন বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িয়া গেল ; প্রলয়ের অন্ধকারে অভ্ৰভেদী বেদনার গিরিশৃঙ্গে নিজেকে একলা লইয়া দাড়াইতে হইল। সেই হইতে নিজের নির্জন সঙ্গকে সে ভয় করিতে আরম্ভ করিয়াছে ; জোর করিয়া নিজের ঘাড়ে কাজ চাপাইয়া এই সঙ্গীটিকে সে কোনোমতেই অবকাশ দিতে চায় না। কিন্তু আজ নিজের সেই অন্তরবাসীকে বিহারী কোনোমতেই ঠেলিয়া রাখিতে পারিল না। কাল বিনোদিনীকে বিহারী দেশে পৌছাইয়া দিয়া আসিয়াছে, তাহার পর হইতে সে যে-কোনো কাজে যে-কোনো লোকের সঙ্গেই আছে, তাহার গুহাশায়ী বেদনাতুর হৃদয় তাহাকে নিজের নিগৃঢ় নির্জনতার দিকে অবিশ্রাম আকর্ষণ করিতেছে । து. শ্রান্তি ও অবসাদে আজ বিহারীকে পরাস্ত করিল । রাত্রি তখন নয়টা হইবে ; বিহারীর গৃহের সন্মুখবর্তী দক্ষিণের ছাতের উপর দিনান্তরম্য গ্রীষ্মের বাতাস