পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি 藝 84 & 8रे পরদিন প্রাতে মহেন্দ্র মাকে বলিল, “মা, পড়াশুনার জন্ত আমার একটি নিরিবিলি স্বতন্ত্র ঘর চাই । কাকীমা যে ঘরে থাকিতেন, সেই ঘরে আমি থাকিব ।” মা খুশি হইয়া উঠিলেন– “তবে তো মহিন বাড়িতেই থাকিবে । তবে তো বউমার সঙ্গে মিটমাট হইয়া গেছে। আমার এমন সোনার বউকে কি মহিন চিরদিন অনাদর করিতে পারে। এই লক্ষ্মীকে ছাড়িয়া কোথাকার সেই মায়াবিনী ভাইনীটাকে লইয়া কতদিনই বা মানুষ ভুলিয়া থাকিবে ।” 調 মা তাড়াতাড়ি কহিলেন, “তা বেশ তো, মহিন ।” বলিয়া তখনই চাবি বাহির করিয়া রুদ্ধ ঘর খুলিয়া ঝাড়াঝোড়ার ধুমধাম বাধাইয়া দিলেন। “বউ, ও বউ, বউ কোথায় গেল।” অনেক সন্ধানে বাড়ির এক কোণ হইতে সংকুচিতা বধূকে বাহির করিয়া আনা হইল। “একটা সাফ জাজিম বাহির করিয়া দাও ; এ ঘরে টেবিল নাই, এখানে একটা টেবিল পাতিয়া দিতে হইবে ; এ আলো তো এখানে চলিবে না, উপর হইতে ল্যাম্পটা পাঠাইয়া দাও।” এইরূপে উভয়ে মিলিয়া এই বাড়িটির রাজাধিরাজের জন্য অন্নপূর্ণার ঘরে বিস্তৃত রাজাসন প্রস্তুত করিয়া দিলেন। মহেন্দ্র সেবাকারিণীদের প্রতি ভ্ৰক্ষেপমাত্র না করিয়া গম্ভীরমুখে খাতাপত্র বহি লইয়া ঘরে বসিল এবং সময়ের লেশমাত্র অপব্যয় না করিয়া তৎক্ষণাৎ পড়িতে আরম্ভ করিল। সন্ধ্যাবেলায় আহারের পর মহেন্দ্র পুনরায় পড়িতে বসিয়া গেল। সে উপরে তাহার শয়নঘরে শুইবে কি নিচে শুইবে তাহ কেহ বুঝিতে পারিল না। রাজলক্ষ্মী বহুধত্বে আশাকে আড়ষ্ট পুতুলটির মতো সাজাইয়া কহিলেন, “যাও তো বউমা, মহিনকে জিজ্ঞাসা করিয়া এসো, তাহার বিছানা কি উপরে হইবে।” এ-প্রস্তাবে আশার পা কিছুতেই সরিল না, সে নীরবে নতমুখে দাড়াইয়া রহিল । রুই রাজলক্ষ্মী তাহাকে তীব্র ভৎসনা করিতে লাগিলেন । আশা বহুকষ্টে ধীরে ধীরে স্বারের কাছে গেল, কিছুতেই আর অগ্রসর হইতে পারিল না। রাজলক্ষ্মী দূর হইতে বধুর এই ব্যবহার দেখিয়া বারান্দার প্রান্তে দাড়াইয়া ক্রুদ্ধ ইঙ্গিত করিতে লাগিলেন। আশা মরিয়া হইয়া ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল ৷ মহেন্দ্র পশ্চাতে পদশব্দ শুনিয়া বই হইতে মাথা না তুলিয়া কহিল, “এখনো আমার দেরি আছে— আবার কাল ভোরে উঠিয়া পড়িতে হইবে— আমি এইখানেই শুইব ।” কী লজ । আশা কি মহেন্দ্রকে উপরের ঘরে গুইতে যাইবার জন্ত সাধিতে আসিয়াছিল।