পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আত্মশক্তি @@@ পরসমাজের অধিকার নির্ণয় করিতেন— এমনভাবে করিতেন যাহাতে পরম্পরের মধ্যে নিয়ত বিরোধ ঘটিত না । এখন কথায় কথায় ভিন্ন ভিন্ন পক্ষে দ্বন্দ্ব বাধিয়া উঠিতেছে, এই দ্বন্দ্ব অশাস্তি, অব্যবস্থা ও দুর্বলতার কারণ। যেখানে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব বাধিতেছে না সেখানে ভিতরে ভিতরে অলক্ষিতভাবে সমাজ বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িতেছে । এই ক্ষয়রোগও সাধারণ রোগ নহে। এইরূপে সমাজ পরের সঙ্গে আপনার সীমানির্ণয় সম্বন্ধে কোনো কতৃত্বপ্রকাশ করিতেছে না ; নিজের ক্ষয়নিবারণের প্রতিও তাহার কতৃত্ব জাগ্রত নাই। ষাহ। আপনি হইতেছে তাহাই হইতেছে ; যখন ব্যাপারটা অনেকদূর অগ্রসর হইয়া পরিস্ফুট হইতেছে তখন মাঝে মাঝে হাল ছাড়িয়া বিলাপ করিয়া উঠিতেছে। কিন্তু, আজ পর্যন্ত বিলাপে কেহ বন্যাকে ঠেকাইতে পারে নাই এবং রোগের চিকিৎসাও বিলাপ নহে । বিদেশী শিক্ষা বিদেশী সভ্যতা আমাদের মনকে আমাদের বুদ্ধিকে যদি অভিভূত করিয়া না ফেলিত তবে আমাদের সামাজিক স্বাধীনতা এত সহজে লুপ্ত হইতে বসিত না । গুরুতর রোগে যখন রোগীর মস্তিষ্ক বিকল হয় তখনই ডাক্তার ভয় পায় । তাহার কারণ, শরীরের মধ্যে রোগের আক্রমণ-প্রতিরোধের যে-ব্যবস্থা তাহা মস্তিষ্কই করিয়া থাকে- সে যখন অভিভূত হইয়া পড়ে তখন বৈদ্যের ঔষধ তাহার সর্বপ্রধান সহায় হইতে বঞ্চিত হয় । প্রবল ও বিচিত্র শক্তিশালী যুরোপীয় সভ্যতা অতি সহজে আমাদের মনকে অভিভূত করিয়াছে । সেই মনই সমাজের মস্তিষ্ক ; বিদেশী প্রভাবের হাতে সে যদি আত্মসমপণ করে তবে সমাজ আর আপনার স্বাধীনতা রক্ষা করিবে কী করিয়া । এইরূপে বিদেশী শিক্ষার কাছে সমাজের শিক্ষিত লোক হৃদয়মনকে অভিভূত হইতে দিয়াছে বলিয়া কেহ বা তাহাকে গালি দেয়, কেহ বা প্রহসনে পরিহাস করে । কিন্তু শাস্তভাবে কেহ বিচার করে না যে, কেন এমনটা ঘটিতেছে । ডাক্তাররা বলেন, শরীর যখন সবল ও সক্রিয় থাকে, তখন রোগের আক্রমণ ঠেকাইতে পারে । নিদ্রিত অবস্থায় সদিকসি-ম্যালেরিয়া চাপিয়া ধরিবার অবসর পায় । বিলাতি সভ্যতার প্রভাবকে রোগের সঙ্গে তুলনা করিলাম বলিয়া মার্জনা প্রার্থনা করি । স্বস্থানে সকল জিনিসই ভালো, অস্থানে পতিত ভালো জিনিসও জঞ্জাল । চোখের কাজল গালে লেপিলে লজার বিষয় হইয়া উঠে । আমার উপমার ইহাই কৈফিয়ত ।