পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/১৫৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চণ্ডালিকা 8S মা। তুই আয়নার সামনে তখন নাচছিলি – তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন ? প্রকৃতি । ধিক্ ধিক্, কী লজ্জা ! মনে হচ্ছিল, থেকে থেকে চোখ লাল হয়ে উঠছে, অভিশাপ দিতে যাচ্ছেন। আবার তখনি পা দিয়ে মাড়িয়ে দলে ফেলছেন রাগের অঙ্গারগুলো । শেষকালে দেখলেম, তার রাগ ফিরল কাপতে কঁপিতে শেলের মতো নিজের দিকে, বিধল গিয়ে মর্মের মধ্যে । ম। সমস্ত সহ করলি তুই ? : প্রকৃতি । আশ্চর্য হয়ে গেলুম । আমি, এই আমি, এই তোমার মেয়ে, কোথাকার কে তার ঠিকানা নেই– তার দুঃখ আর এর দুঃখ আজ এক । কোন স্বষ্টির যজ্ঞে এমন ঘটে— এতবড়ো কথা কেউ কোনোদিন ভাবতে পারত ! মা । এই উৎপাত শাস্ত হবে কতদিনে । প্রকৃতি । যতদিন না আমার দুঃখ শাস্ত হবে । ততদিন দুঃখ তাকে দেবই । আমি মুক্তি যদি না পাই তিনি মুক্তি পাবেন কী করে । মা ! তোর আয়না শেষ দেখেছিস কবে । প্রকৃতি । কাল সন্ধ্যেবেলায় । বৈশালীর সিংহদরজা পেরিয়েছেন কিছুদিন আগে, গভীর রাত্রে । বোধ হয় গোপনে, শ্রমণদের না জানিয়ে । তার পরে কখনো দেখেছি, নদী পেরলেন খেয়া নৌকোয় ; দেখেছি দুর্গম পাহাড়ে ; দেখেছি সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, মাঠে তিনি একা ; দেখেছি অন্ধকারে, গভীর রাত্রে, বনের পথে । যত যাচ্ছে দিন, স্বপ্নের ঘোর আসছে ঘন হয়ে, চলেছেন কোনো বিচার না করে, নিজের সঙ্গে সমস্ত দ্বন্দ্ব শেষ করে দিয়ে । মুখে একটা বিহবলতা, দেহে একটা শৈথিল্য— দুই চোখের সামনে যেন বস্তু নেই ; নেই সত্যমিথ্যা, নেই ভালোমন্দ ; আছে চিস্তাহীন অন্ধ লক্ষ্য, নেই তার কোনো অর্থ। মা ! আজি কোথায় এসেছেন আন্দাজ করতে পারিস ? প্রকৃতি । কাল সন্ধ্যার সময় দেখেছি উপলী নদীর ধারে পাটল গ্রামে । নববর্ষায় জলের ধারা উন্মত্ত, ঘাটের কাছে পুরোনো পিপুল গাছ, জোনাকি জলছে ডালে ডালে, তলায় শেওলা-ধরা বেদী— সেইখানে এসেই হঠাৎ চমকে দাড়ালেন। অনেকদিনের চেনা জায়গা ; শুনেছি, ঐখানে বলে ভগবান বুদ্ধ একদিন রাজা স্বপ্রভালকে উপদেশ দিয়েছিলেন । দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন, স্বপ্ন বুঝি ভাঙল হঠাৎ । তখনি ছুড়ে ফেলে দিলেম আয়না, ভয় হল কী জানি কী দেখব । তারপরে গেছে সমস্ত দিন, কিছু জানতে চাই নি, আশা করছি, আশা ছাড়ছি—এমনি করে আাছি বলে। এখন রাত আসছে অন্ধকার হয়ে । প্লহরী স্থাক দিয়ে চলেছে রাস্তায়, এক প্রহর গেল বুঝি