পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨8ર রবীন্দ্র-রচনাবলী বিপদ আর কী হইতে পারে। আমার গোপাল আসিয়া দেখিল, তখনো তাহার জন্য ননী তৈরি নাই, তাই সে রাগ করিয়া চলিয়া গেছে—আমি আজও মাঠে ঘাটে তাহাকে খুজিয়া বেড়াইতেছি। ছেলেটি ছিল বাপের নয়নের মণি । আমি তাহাকে যত্ব করিতে শিথি নাই বলিয়া তাহার বাপ কষ্ট পাইতেন । কিন্তু, তাহার হৃদয় যে ছিল বোবা, আজ পর্যন্ত র্তাহার দুঃখের কথা কাহাকেও কিছু বলিতে পারেন নাই । মেয়েমানুষের মতো তিনি ছেলের যত্ব করিতেন । রাত্রে ছেলে কঁাদিলে আমার অল্পবয়সের গভীর ঘুম তিনি ভাঙাইতে চাহিতেন না। নিজে রাত্রে উঠিয়া দুধ গরম করিয়া খাওয়াইয়া কতদিন খোকাকে কোলে লষ্টয়া ঘুম পাড়াইয়াছেন, আমি তাহা জানিতে পারি নাই। র্তাহার সকল কাজই এমনি নি:শব্দে। পূজাপার্বণে জমিদারদের বাড়িতে যখন যাত্রা বা কথা হইত তিনি বলিতেন, “আমি রাত জাগিতে পারি না, তুমি যাও, আমি এখানেই থাকি ।” তিনি ছেলেটিকে লইয়া না থাকিলে আমার যাওয়া হইবে না, এই জন্য র্তাহার ছুতা । আশ্চর্য এই, তবু ছেলে আমাকেই সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসিত । সে যেন বুঝিত, স্বযোগ পাইলেই আমি তাহাকে ফেলিয়া চলিয়া যাইব, তাই সে যখন আমার কাছে থাকিত তখনও ভয়ে ভয়ে থাকিত । সে অামাকে অল্প পাইয়াছিল বলিয়াই আমাকে পাইবার আকাঙ্ক্ষা তাহার কিছুতেষ্ট মিটিতে চাহিত না । আমি যখন নাহিবার জন্য ঘাটে যাইতাম তাহাকে সঙ্গে লইবার জন্য সে আমাকে রোজ বিরক্ত করিত । ঘাটে সঙ্গিনীদের সঙ্গে আমার মিলনের জায়গা, সেখানে ছেলেকে লইয়। তাহার খবরদারি করিতে আমার ভালো লাগিত না । সেইজন্য পারতপক্ষে তাহাকে লইয়া যাইতে চাহিতাম না। সেদিন শ্রাবণ মাস । থাকে থাকে ঘন কালো মেঘে দুই-প্রহর বেলাটাকে একেবারে আগাগোড় মুড়ি দিয়া রাখিয়াছে। স্বানে যাইবার সময় থোকা কান্না জুড়িয়া দিল । নিস্তারিণী আমাদের হেঁসেলের কাজ করিত, তা হাকে বলিয়া গেলাম, “বাছা, ছেলেকে দেখিয়ো, আমি ঘাটে একটা ডুব দিয়া আসি গে।” ঘাটে ঠিক সেই সময়টিতে আর কেহ ছিল না। সঙ্গিনীদের আসিবার অপেক্ষায় আমি সাতার দিতে লাগিলাম। দিঘিট প্রাচীনকালের ; কোন রানী কবে খনন করাইয়াছিলেন তাই ইহার নাম রানীসাগর। সাতার দিয়া এই দিঘি এপার-ওপার করা মেয়েদের মধ্যে কেবল আমিই পারিতাম। বর্ষায় তখন কুলে কুলে জল। দিঘি যখন প্রায় অধোকট। পার হইয়া গেছি এমন সময় পিছন হইতে ডাক শুনিতে পাইলাম, “মা” ফিরিয়া দেখি,