পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ Ꮍ8? আমি । আমার মধ্যে ষ-কিছু তোমাদের মেজবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে, সে তোমরা পছন্দ কর নি, চিনতেও পার নি ; আমি যে কবি, সে এই পনেরো বছরেও তোমাদের কাছে ধরা পড়ে নি । তোমাদের ঘরের প্রথম স্থতির মধ্যে সব চেয়ে যেটা আমার মনে জাগছে সে তোমাদের গোয়ালঘর। অন্দরমহলের সিড়িতে ওঠবার ঠিক পাশের ঘরেই তোমাদের গোরু থাকে, সামনের উঠোনটুকু ছাড়া তাদের আর নড়বার জায়গা নেই। সেই উঠোনের কোণে তাদের জাবনা দেবার কাঠের গামলা । সকালে বেহারার নানা কাজ ; উপবাসী গোরুগুলো ততক্ষণ সেই গামলার ধারগুলো চেটে চেটে চিবিয়ে চিবিয়ে খাব লা করে দিত। আমার প্রাণ র্কাদত । আমি পাড়াগায়ের মেয়ে— তোমাদের বাড়িতে যেদিন নতুন এলুম সেদিন সেই দুটি গোরু এবং তিনটি বাছুরই সমস্ত শহরের মধ্যে আমার চিরপরিচিত আত্মীয়ের মতো আমার চোখে ঠেকল। যতদিন নতুন বউ ছিলুম নিজে না খেয়ে লুকিয়ে ওদের খাওয়াতুম ; যখন বড়ো হলুম তখন গোরুর প্রতি আমার প্রকাগু মমতা লক্ষ্য করে আমার ঠাট্টার সম্পৰ্কীয়েরা আমার গোত্র সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলেন । আমার মেয়েটি জন্ম নিয়েই মারা গেল । আমাকেও সে সঙ্গে যাবার সময় ভাক দিয়েছিল। সে যদি বেঁচে থাকত তাহলে সেই আমার জীবনে যা-কিছু বড়ো, যা-কিছু সত্য সমস্ত এনে দিত ; তখন মেজবউ থেকে একেবারে মা হয়ে বসতুম। ম যে এক-সংসারের মধ্যে থেকেও বিশ্ব-সংসারের। মা হবার দুঃখটুকু পেলুম কিন্তু মা হবার মুক্তিটুকু পেলুম না । মনে আছে, ইংরেজ ডাক্তার এসে আমাদের অন্দর দেখে আশ্চর্য হয়েছিল এবং আঁতুড়ঘর দেখে বিরক্ত হয়ে বকবকি করেছিল। সদরে তোমাদের একটুখানি বাগান আছে। ঘরে সাজসজ্জা আসবাবের অভাব নেই। আর, অন্দরটা যেন পশমের কাজের উলটো পিঠ ; সেদিকে কোনো লজ্জা নেই, শ্ৰী নেই, সজ্জা নেই। সেদিকে আলো মিটমিটু করে জলে ; হাওয়া চোরের মতো প্রবেশ করে ; উঠোনের আবর্জন নড়তে চায় না ; দেয়ালের এবং মেজের সমস্ত কলঙ্ক অক্ষয় হয়ে বিরাজ করে । কিন্তু, ডাক্তার একটা ভুল করেছিল ; সে ভেবেছিল, এটা বুঝি আমাদের অহোরাত্র দুঃখ দেয় । ঠিক উলটো— অনাদর জিনিসটা ছাইয়ের মতে, সে ছাই আগুনকে হয়তে ভিতরে ভিতরে জমিয়ে রাখে কিন্তু বাইরে থেকে তার তাপটকে বুঝতে দেয় না। আত্মসম্মান যখন কমে যায় তখন অনাদরকে তো অন্তাধ্য বলে মনে হয় না । সেই জন্যে তার বেদনা নেই। তাই তো মেয়েমানুষ দুঃখ বোধ করতেই লজ্জা পায় । আমি তাই বলি, মেয়েমানুষকে २७| ७१