পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩২৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ 194 হইয়া ওঠে, রৌদ্রে নারিকেলের পাতাগুলো ঝিলমিল করে, সে যেন তার বুকের মধ্যে কথা কহিতে থাকে। পণ্ডিতমশায় গীত পড়িয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন, সেটা ব্যর্থ হইয়া যায় ; অথচ সেই সময়ে তার জানালার বাহিরের বাগানে শুকনো পাতার উপর দিয়া যখন কাঠবিড়ালি খঙ্গ খস করিয়া গেল, বহুদূর আকাশের হৃদয় ভেদ করিয়া চিলের একটা তীক্ষু ডাক আসিয়া পৌছিল, ক্ষণে ক্ষণে পুকুরপাড়ের রাস্ত দিয়া গোরুর গাড়ি চলার একটা ক্লাস্ত শব্দ বাতাসকে আবিষ্ট করিল, এই সমস্তই তার মনকে স্পর্শ করিয়া অকারণে ব্যাকুল করে । একে তো কিছুতেই বৈরাগ্যের লক্ষণ বলা যায় না। যে বিস্তীর্ণ জগংটা তপ্ত প্রাণের জগৎ – পিতামহ ব্ৰহ্মার রক্তের উত্তাপ হইতেই যার আদিম বাষ্প আকাশকে ছাইয়া ফেলিতেছিল ; যা তার চতুর্মুখের বেদবেদান্ত-- উচ্চারণের অনেক পুর্বের স্বষ্টি ; যার রঙের সঙ্গে, ধ্বনির সঙ্গে, গন্ধের সঙ্গে সমস্ত জীবের নাড়ীতে নাড়ীতে বোঝাপড়া হইয়া গেছে; তারই ছোটো বড়ো হাজার হাজার দূত জীবহৃদয়ের খাসমহলে আনাগোনার গোপন পথটা জানে— ষোড়শী তে কৃচ্ছ সাধনের কাটা গাড়িয়া আজও সে-পথ বন্ধ করিতে পারিল না । কাজেই গেরুয়া রঙকে আরও ঘন করিয়া গুলিতে হুইবে । ষোড়শী পণ্ডিতমশায়কে ধরিয়| পড়িল, “আমাকে যোগাসনের প্রণালী বলিয়া দিন ।” পণ্ডিত বলিলেন, “ম, তোমার তো এ-সকল পন্থায় প্রয়োজন নাই। সিদ্ধি তো পাক আমলকীর মতো আপনি তোমার হাতে আসিয়া পৌছিয়াছে।” তার পুণ্যপ্রভাব লইয়া চারি দিকে লোকে বিস্ময় প্রকাশ করিয়া থাকে, ইহাতে ষোড়শীর মনে একটা স্তবের নেশা জমিয়া গেছে। এমন একদিন ছিল, বাড়ির বি চাকর পর্যন্ত তাকে কৃপাপাত্রী বলিয়া মনে করিয়াছে। তাই আজ যখন তাকে পুণ্যবতী বলিয়া সকলে ধন্য-ধন্ত করিতে লাগিল, তখন তার বহুদিনের গৌরবের তৃষ্ণ মিটিবার স্বৰোগ হইল। সিদ্ধি যে সে পাইয়াছে, এ কথা অস্বীকার করিতে তার মুখে বাধে— তাই পণ্ডিতমশায়ের কাছে সে চুপ করিয়া রহিল। মাখনের কাছে ষোড়শী আসিয়া বলিল, “বাবা, আমি কার কাছে প্রাণায়াম অভ্যাস করিতে শিখি বলো ভো ।” মাখন বলিলেন, “সেটা না শিখিলেও তো বিশেষ অস্থবিধা দেখি না। তুমি যত দূরে গেছ, সেইখানেই তোমার নাগাল ক-জন লোকে পায় ।” তা হউক, প্রাণায়াম অভ্যাস করিতেই হইবে। এমনি দুৰ্দৈৰ ষে, মানুষও জুটিয়া গেল। মাখনের বিশ্বাস ছিল, আধুনিক কালের অধিকাংশ বাঙালিই মোটামুটি তারই মতো— অর্থাং থায়-দায় ঘুমায়, এবং পরের কুৎসাঘটিত ব্যাপার ছাড়া জগতে আর