পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৬৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী وا ?) (S বিষয়কে জানার কাজে আছে বিজ্ঞান । এই জানার থেকে নিজের ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে রাখার সাধনাই বিজ্ঞানের । মানুষের আপনাকে দেখার কাজে আছে সাহিত্য । তার সত্যতা মানুষের আপন উপলব্ধিতে, বিষয়ের যাথার্থ্যে নয়। সেটা অদ্ভূত হোক, অতথ্য হোক, কিছুই আসে-যায় না। এমন-কি, সেই অদ্ভূতের সেই অতথ্যের উপলব্ধি যদি নিবিড় হয় তবে সাহিত্যে তাকেই সত্য বলে স্বীকার করে নেবে। মানুষ শিশুকাল থেকেই নানা ভাবে আপন উপলব্ধির ক্ষুধায় ক্ষুধিত ; রূপকথার উদ্ভব তারই থেকে । কল্পনার জগতে চায় সে হতে নানাখানা ; রামও হয়, হনুমানও হয়, ঠিকমতে৷ হতে পারলেই খুশি । তার মন গাছের সঙ্গে গাছ হয়, নদীর সঙ্গে নদী । মন চায় মিলতে, মিলে হয় খুশি । মানুষের আপনাকে নিয়ে এই বৈচিত্র্যের লীলা সাহিত্যের কাজ । সে লীলায় সুন্দরও আছে, অসুন্দরও আছে । একদিন নিশ্চিত স্থির করে রেখেছিলেম, সৌন্দর্যরচনাই সাহিত্যের প্রধান কাজ । কিন্তু, এই মতের সঙ্গে সাহিত্যের ও আর্টের অভিজ্ঞতাকে মেলানো যায় না দেখে মনটাতে অত্যন্ত খটকা লেগেছিল। ভাড় দত্তকে সুন্দর বলা যায় না— সাহিত্যের সৌন্দর্যকে প্রচলিত সৌন্দর্য্যের ধারণায় ধরা গেল না । তখন মনে এল, এতদিন যা উলটো করে বলছিলুম তাই সোজা করে বলার দরকার। বলতুম, সুন্দর আনন্দ দেয়, তাই সাহিত্যে সুন্দরকে নিয়ে কারবার । বস্তুত বলা চাই, যা আনন্দ দেয় তাকেই মন সুন্দর বলে, আর সেটাই সাহিত্যের সামগ্রী । সাহিত্যে কী দিয়ে এই সৌন্দর্যের বোধকে জাগায় সে কথা গৌণ, নিবিড় বোধের দ্বারাই প্রমাণ হয় সুন্দরের । তাকে সুন্দর বলি বা না-বলি তাতে কিছু আসে-যায় না, বিশ্বের অনেক উপেক্ষিতের মধ্যে মন তাকেই অঙ্গীকার করে নেয়। সাহিত্যের বাইরে এই সুন্দরের ক্ষেত্র সংকীর্ণ। সেখানে প্রাণতত্ত্বের অধিকৃত মাছুষকে অনিষ্টকর কিছুতে আনন্দ দেয় না । সাহিত্যে দেয়, নইলে ‘ওথেলো’ নাটককে কেউ ছুতে পারত না । এই প্রশ্ন আমার মনকে উদবেজিত করেছিল যে, সাহিত্যে দুঃখকর কাহিনী কেন আনন্দ দেয় এবং সেই কারণে কেন তাকে সৌন্দর্যের কোঠায় গণ্য করি।