পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৪৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ৩২৫ খান হইয়া গেছে। সেই থানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্ত নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, “মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।” মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন । ঠিকাগাড়ি কিছুদূর সিধা গিয়া পার্ক স্ত্রীটের সম্মুখে ময়দানের রাস্তায় মোড় লইল । মজুমদার আর-একবার ইংরেজি শপথ উচ্চারণ করিয়া আপন মনে কহিল, এ কী ! এ তে আমার পথ নয় । তার পরে নিদ্রাজড় অবস্থায় ভাবিল, ‘হবেও বা, এইটিই হয়তো সোজা রাস্তা।’ ময়দানে প্রবেশ করিতেই মজুমদারের গা কেমন করিয়া উঠিল। হঠাৎ তাহার মনে হইল – কোনো লোক নাই তবু তাহার পাশের জায়গাটা যেন ভর্তি হইয়। উঠতেছে ; যেন তাহার আসনের শূন্য অংশের আকাশটা নিরেট হইয়া তাহাকে ঠাসিয়া ধরিতেছে। মজুমদার ভাবিল— এ কী ব্যাপার ! গাড়িটা আমার সঙ্গে এ কিরকম ব্যবহার শুরু করিল। “এই গাড়োয়ান, গাড়োয়ান !” গাড়োয়ান কোনো জবাব দিল না। পিছনের খড়খড়ি খুলিয়া ফেলিয়া সহিসটার হাত চাপিয়া ধরিল ; কহিল, “তুম ভিতর আকে বৈঠে।” সহিস ভীতকণ্ঠে কহিল, "নেহি, সাব, ভিতর নেহি জায়েগ৷ ” শুনিয়া মজুমদারের গায়ে কাটা দিয়া উঠিল ; সে জোর করিয়া সহিসের হাত চাপিয়া কহিল, "জলদি ভিতর আও।” সহিস সবলে হাত ছিনাইয়া লইয়া নামিয়া দৌড় দিল । তখন মজুমদার পাশের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া দেখিতে লাগিল ; কিছুই দেখিতে পাইল না, তবু মনে হইল, পাশে একটা অটল পদার্থ একেবারে চাপিয়া বসিয়া আছে। কোনোমতে গলায় আওয়াজ আনিয়া মজুমদার কহিল, “গাড়োয়ান, গাড়ি রেখো।” বোধ হইল, গাড়োয়ান যেন দাড়াইয়া উঠিয়া দুই হাতে রাশ টানিয়া ঘোড়া থামাইতে চেষ্ট করিল— ঘোড়া কোনোমতেই থামিল না। না থামিয়া ঘোড়া দুটা রেড রোডের রাস্ত ধরিয়া পুনর্বার দক্ষিণের দিকে মোড় লইল । মজুমদার ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আরে, কাহ ধাত।” কোনো উত্তর পাইল না। পাশের শূন্ততার দিকে রহিয়া রহিয়া কটাক্ষ করিতে করিতে মজুমদারের সর্বাঙ্গ দিয়া ঘাম ছুটিতে লাগিল। কোনোমতে আড়ষ্ট হইয়া নিজের শরীরটাকে যতদূর সংকীর্ণ করিতে হয় তাহা সে করিল, কিন্তু সে যতটুকু জায়গা ছাড়িয়া দিল ততটুকু জায়গা ভরিয়া উঠিল। মজুমদার মনে মনে তর্ক