পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৯৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


br8* রবীন্দ্র-রচনাবলী তার প্রণাম তুমি নাও। যে গানগুলি এতদিন গ্রহণ করেছ সেই তার আপন গানের বন্ধনেই সে বাধা রইল তোমার দ্বারে— তোমার উৎসবলীলায় সে চিরদিন রয়ে গেল তোমার সাথের সাথি । তোমাকে সে তার স্বরের রাখী পরিয়েছে- তার চিরপরিচয় তোমার ফুলে ফুলে, তোমার পদপাতকম্পিত খামল শম্পবীথিকায় । বসস্তে বসস্তে তোমার কবিরে দাও ডাক ওর ভয় হয়েছে সব কথা বলা হল না বুঝি, এ দিকে বসন্তর পালা তো সাদ হয়ে এল। ওর মল্লিকাবনে এখনি তো পাপড়িগুলি সব পড়বে ঝরে— তখন বাণী পাবে কোথায় । ত্বরা কর গো, ত্বর করু। বাতাস তপ্ত হয়ে এল, এই বেলা রিক্ত হবার আগে তোর শেষ অঞ্জলি পূর্ণ করে দে ; তার পরে আছে করুণ ধূলি, তার আঁচলে সব ঝরা ফুলের বিরাম । যখন মল্লিকাবনে প্রথম ধরেছে কলি সুন্দরের বীণার তারে কোমল গান্ধারে মীড় লেগেছে। আকাশের দীর্ঘনিশ্বাস বনে বনে হায় হায় করে উঠল, পাতা পড়ছে ঝরে ঝরে । বসন্তের ভূমিকায় ওই পাতাগুলি একদিন শাখায় শাখায় আগমনীর গানে তাল দিয়েছিল, তারাই আজ যাবার পথের ধূলিকে ঢেকে দিল, পায়ে পায়ে প্রণাম করতে লাগল বিদায়পথের পথিককে। নবীনকে সন্ন্যাসীর বেশ পরিয়ে দিলে ; বললে, তোমার উদয় সুন্দর, তোমার অস্তও সুন্দর হোক । ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে মন থাকে স্বপ্ত, তখনো দ্বার থাকে খোলা, সেইথান দিয়ে করে আনাগোনা হয় ; উত্তরায়ের গন্ধ আসে ঘরের মধ্যে, ভূইচাপা ফুলের ছিন্ন পাপড়িগুলি লুটিয়ে থাকে তার যাওয়ার পথে ; তার বীণা থেকে বসন্তবাহারের রেশটুকু কুড়িয়ে নেয় মধুকরগুঞ্জরিত দক্ষিণের হাওয়া ; কিন্তু জানতে পাই নে, সে এসেছিল। জেগে উঠে দেখি তার আকাশপারের মালা সে পরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু এ-যে বিরহের মালা । কখন দিলে পরায়ে বনবন্ধুর যাবার সময় হল, কিন্তু হে বনস্পতি শাল, অবসানের দিন থেকে তুমি অবসাদ ঘুচিয়ে দিলে। উৎসবের শেষ বেলাকে তোমার অক্লাস্ত মঞ্জরী ঐশ্বর্যে দিল ভরিয়ে। নবীনের শেষ জয়ধ্বনি তোমার বীরকণ্ঠে । সেই ধ্বনি আজ আকাশকে পূর্ণ করল, বিষাদের স্নানতা দূর করে দিলে। অরণ্যভূমির শেষ আনন্দিত বাণী তুমিই শুনিয়ে দিলে যাবার পথের পথিককে, বললে পুনর্দশনায় । তোমার আনন্দের সাহস কঠোর বিচ্ছেদের সমুখে দাড়িয়ে।