পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৮২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী سرامارها বসিয়ে ও আমার মুখে চেয়ে রইল। তার পরে, যেমন বাজপাখির পাথার মধ্যে আঙল চালাচ্ছিল তেমনি করে আমার হাত নিয়ে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একটু পরে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, “আমাকে ভয় করে না ? আমি বললুম, একটুও না। তখন আমার খোলা চুলের মধ্যে দুই হাত ভরে দিয়ে কতক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল। বিশু । তোমার কেমন লাগল। নন্দিনী । ভালো লাগল। কি-রকম বলব ? ও যেন হাজার বছরের বটগাছ, আমি যেন ছোট্ট পাখি । ওর ডালের একটি ডগায় কখনো যদি একটু দোল খেয়ে যাই, নিশ্চয় ওর মজ্জার মধ্যে খুশি লাগে। ওই একলা প্রাণকে সেই খুশিটুকু দিতে ইচ্ছে করে। বিশু। তার পরে ও কী বললে । নন্দিনী। একসময় বোকে উঠে ওর বর্শাফলার মতো দৃষ্টি আমার মুখের উপর রেখে হঠাৎ বলে উঠল, “আমি তোমাকে জানতে চাই । আমার কেমন গা শিউরে উঠল। বললুম, ‘জানবার কী আছে। আমি কি তোমার পুথি । সে বললে, “পুথিতে যা আছে সব জানি, তোমাকে জানি নে ? তার পরে কি-রকম ব্যগ্র হয়ে উঠে বললে, ‘রঞ্জনের কথা আমাকে বলে । তাকে কি-রকম ভালোবাস । আমি বললুম, ‘জলের ভিতরকার হাল যেমন আকাশের উপরকার পালকে ভালোবাসে— পালে লাগে বাতাসের গান, আর হালে জাগে ঢেউয়ের নাচ । মস্ত একটা লোভী ছেলের মতো একদৃষ্টে তাকিয়ে চুপ করে শুনলে । হঠাৎ চমকিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘ওর জন্যে প্রাণ দিতে পার ? আমি বললুম, এখখনি ও যেন রেগে গর্জন করে বললে, 'কথখনো না। আমি বললুম, ‘হঁ৷ পারি। তাতে তোমার লাভ কী।’ বললুম, ‘জানি নে। তখন ছটফট করে বলে উঠল, “যাও, আমার ঘর থেকে যাও, যাও, কাজ নষ্ট করো না।’ মানে বুঝতে পারলুম না। বিশু। সব কথার পস্ট মানে ও জানতে চায়। যেটা ও বুঝতে পারে না, সেটাতে ওর মন ব্যাকুল করে দেয়, তাতেই ও রেগে ওঠে । নন্দিনী । পাগলভাই, ওর উপর দয়া হয় না তোমার ? বিশু । যেদিন ওর পরে বিধাতার দয়া হবে, সেদিন ও মরবে। নন্দিনী । না না, তুমি জান না, বেঁচে থাকবার জন্যে ও কি-রকম মরিয়া হয়ে আছে । বিণ্ড। ওর বঁাচ বলতে কী বোঝায়, সে তুমি আজই দেখতে পাবে ; জানিনে সইতে পারবে কিনা।