পাতা:রাধারাণী-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/১০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ইহার বা হয়, একটা চূড়ান্ত স্থির করিবার জন্য মামি রজনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে গেলাম। রজনীর সঙ্গে আমার বিবাহের কথা উত্থাপিত হওয়া অবধি আমি আর রজনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে বড় যাইতাম না—কেন না, এখন আমাকে দেখিলে রজনী কিছু লজ্জিত হইত। কিন্তু আজ না গেলে নয় বলিয়া রজনীর কাছে গেলাম। সে বাড়ীতে আমার অবারিত দ্বার। আমি রজনীর সন্ধানে তাহার ঘরে গিয়া তাহাকে দেখিতে পাইলাম না । ফিরিয়া আসিতেছি, এমত সময়ে দেখিতে পাইলাম, রজনী অার একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে উপরে উঠতেছে। সে স্ত্রীলোককে দেখিয়াই চিনিলাম—অনেক দিন দেখি নাই, কিন্তু দেখিয়াই চিনিলাম যে ঐ গজেন্দ্ৰগামিনী ললিতলবঙ্গলত। রজনী ইচ্ছাপূর্বক জীর্ণ বস্ত্র পরিয়াছিল, লজ্জায় সে লবঙ্গলতার সঙ্গে ভাল করিয়া কথা কহিতেছিল না। লবঙ্গলতী হাসিতে উছলিয়া পড়িতেছিল—রাগ বা বিদ্বেষের কিছুমাত্র লক্ষণ দেখা গেল না। সে হাসি অনেক দিন শুনি নাই। সে হাসি তেমনই ছিল—পূর্ণিমার সমুদ্রে ক্ষুদ্র তরঙ্গের তুল্য, সপুষ্প বসন্তলতার আন্দোলন তুল্য—তাহা হইতে মুখ, ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয়া, ঝরিয়া পড়িতেছিল। আমি অবাক হইয়া নিস্পন্দশরীরে, সশঙ্কচিত্তে, এই বিচিএচরিত্র রমণীর মানসিক শক্তির আলোচনা করিতেছিলাম। ললিতলবঙ্গলত কিছুতেই টলে না। লবঙ্গলতী মহান ঐশ্বৰ্য্য হইতে দারিদ্র্যে পড়িয়াছে—তবু সেই সুখময় হাসি ; যে রজনী হইতে এই ঘোর বিপদ ঘটিয়াছে, তাহারই গৃহে উঠিতেছে, তাহার সঙ্গে আলাপ করিতেছে, তবু সেই মুখময় হাসি। আমি সম্মুখে—তবু সেই মুখময় হাসি। অথচ আমি জানি, লবঙ্গ কোন কথাই ভুলে নাই । আমি সরিয়া পার্থের ঘরে গেলাম। লবঙ্গলতা প্রথমে সেই ঘরে প্রবেশ করিল— নিঃশঙ্কচিত্ত্বে, আজ্ঞাদায়িনী রাজরাজেশ্বরীর স্যায় রজনীকে বলিল, “রজনি—তুই এখন আর কোথাও যা ! তোর বরের সঙ্গে আমার গোপনে কিছু কথা আছে। ভয় নাই ! তোর বর সুন্দর হলেও আমার বৃদ্ধ স্বামীর অপেক্ষা সুন্দর নহে।” রজনী অপ্রতিভ হইয়া, কি ভাবিতে ভাবিতে সরিয়া গেল । به ললিতলবঙ্গলত ভ্ৰকুটি কুটিল করিয়া, সেই মধুর হাসি হাসিয়া, ইন্দ্রাণীর মত আমার সম্মুখে দাড়াইল। একবার বৈ কেহ অমরনাথকে আত্মবিস্মৃত দেখে নাই। আবার আত্মবিস্মৃত হইলাম। সে বারও ললিতলবঙ্গলতী—এবারও ললিতলবঙ্গলতা। 2 o