পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১৭০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ইলিয়াসের ‘যুগলবন্দি’

 আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দুটি কালজয়ী উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’ নিয়ে আলোচকদের যতখানি আগ্রহ, প্রায় ততটাই অনাগ্রহ তার ছোটগল্প সম্পর্কে। অথচ এই প্রবলভাবে বিবর্তনশীল সাহিত্য-মাধ্যমেও তিনি অনন্য সৃষ্টিপ্রতিভার স্থায়ী শিলমোহর খোদাই করে দিয়েছেন। অন্য ঘর অন্য স্বর’ (১৯৭৬), ‘খোয়ারি’ (১৯৮২), ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫), ‘দোজখের ওম’ (১৯৮৯), ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৭) নামে পাঁচটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। ইলিয়াসের বেশ কিছু ছোটগল্প আমাদের ভিৎ-সুদ্ধ নাড়িয়ে দেয়। এই নিবন্ধের জন্যে ‘দোজখের ওম’ থেকে ‘যুগলবন্দি’ গল্পটি নিয়েছি।

 সরাসরি ছোটগল্পের বয়নবিশ্বে প্রবেশ করার আগে প্রাক্কথন হিসেবে কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করছি লেখকের অনুজ খালিকুজ্জামান ইলিয়াস রচনা সমগ্র (১ম খণ্ড) এর ভূমিকায় কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ-ঋদ্ধ মন্তব্য করেছেন। প্রথমে সেদিকে দৃষ্টিপাত করছি। ভূমিকাকার লিখেছেন, ‘পরিচিত অভিজ্ঞতার প্রায় সর্বস্তরে জীবনকে নির্মোহ দৃষ্টিতে একেবারে এর গভীরতম শাঁস পর্যন্ত অশেষ কৌতূহল নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে শিল্পকর্মে তা বেপরোয়া ভাবে প্রকাশ করার বিরল ক্ষমতা দেখতে পাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায়। প্রকৃতি তাকে এই বিশ্ব পর্যবেক্ষণের ও উপলব্ধির সময় বেশিদিন দেয়নি। হয়তো সেজন্যই এই নাজুক ও স্বল্পায়ু সময়ে তিনি মর্মভেদী দৃষ্টিকে শানিত করে দেখেছেন তার ইন্দ্রিয় ও বোধির চেনা বিশ্বকে। এই দেখা একাধারে নির্মম এবং কৌতুকবহ। নির্মম, কেননা সত্যনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ সব সময়ই নির্মম এবং কৌতুকপ্রদ কেননা মানুষের অসতর্ক ও দুর্বল মুহূর্ত কি ভঙ্গি কি বোস বাক্য বা কাজকে তিনি যেমন অবলীলায় প্রকাশ করেন তাতে পাঠক একই সঙ্গে অস্বস্তি, বিব্রত এবং কৌতুক বোধ না করে পারে না। আর এই দুই অনুভূতি উসকে দেওয়ার শক্তি বড় মাপের লেখকেরই বৈশিষ্ট্য। যে বাস্তবতার আলোয় তিনি জীবন দর্শন করেন তা কখনোই একেবারে চাঁচাছোলা যান্ত্রিক বাস্তবতা নয়। খড়খড়ে শুষ্ক চোখে ইলিয়াস বিশ্ব দেখেননি। চোখে কেবলি খরা নিয়ে সম্ভবত খুব বেশি দূর এগোনো কি খুব বড় মাপের শিল্প রচনা করা যায় না। চোখ তার সিক্তই, কিন্তু সেই সজল চোখ বহির্বিশ্ব এবং অন্তর্বিশ্বকে ঝাপসা না করে বরং আলোর দ্যুতিতে উজ্জ্বলতর করেছে এবং তার উজ্জ্বল, স্বচ্ছ দৃষ্টিপথে যাই পড়েছে তা জীবন্ত এবং সরস হয়ে উঠেছে!' এই বক্তব্য থেকে গল্পকারের জীবনবীক্ষা সম্পর্কে বেশ কিছু সূত্র পেয়ে যাচ্ছি। একই সঙ্গে যার দেখার ধরন নির্মম ও কৌতুকবহ—তিনি নিঃসন্দেহে যুগপৎ নিরাসক্ত ও সংলগ্ন।

১৬৬