বাঙ্গলার পরিচিত পাখী/শামা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

শামা

শামা আমাদের সুপরিচিত পাখী। সুকণ্ঠ গায়ক পাখী হিসাবে ভারতবর্ষে শামা শ্রেষ্ঠতম। বাঙ্গালী কবিগণ সর্ব্বদা ‘শামা’র উল্লেখ করেন। এই পাখীর কথা আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু একে চিনি না। না চিনিবার কারণ পূর্ব্ব প্রবন্ধে উল্লেখ করিয়াছি—শামা গভীর অরণ্য-নিবাসী। একে জানিতে হইলে খাঁচার ভিতর এর সঙ্গে পরিচয় করিতে হইবে।

 “শামা” নামটি মূলতঃ সংস্কৃত কি ফারসী, বলিতে পারি না। আমার মনে হয় মোগল বাদশাহেরাই পক্ষিপালনে পারদর্শিতা দেখাইয়াছিলেন এবং খুব সম্ভবতঃ তাঁহারাই ইহাকে খাঁচায় ধরিয়া, ইহার সঙ্গীতমাধুর্য্য উপভোগ করার রীতি প্রচলিত করেন। মোগল বাদশাহেরা বহুতর বর্ণসঙ্কর গৃহপারাবত উৎপাদন করান; বুলবুল পাখীর মল্লক্রীড়ার রীতি প্রচলিত করেন। সুতরাং এ অনুমান অসঙ্গত হইবে না যে অরণ্যবিহারী এই সুন্দর, সুঠাম ও সুগায়ক পাখীকে আবিষ্কার করিয়া মানুষের আনন্দলাভের জন্য তাঁহারাই পালন করিতে আরম্ভ করেন। ইহাকে “শ্যামা” বানানে চালাইতে চাহিল হয়তো হিন্দুচিত্ত অপ্রসাদ লাভ করিতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য যে লজ্জিত হইবে না তাহা জোর করিয়া বলা যায় না। প্রাক্-মুসলমান ভারতে খাঁচায় পাখী অপরিজ্ঞাত ছিল না বটে, কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যে যে কয়টি গৃহপালিত পাখীর উল্লেখ পাই, তাহারা সকলেই মুক্ত অবস্থায় লোকালয়ের কাছে কাছেই ফেরে—যেমন, শুক, সারিকা, ভবনশিখী, পারাবত। এমন কি যে বুলবুল পাখী ভারতে প্রচুর ও সুলভ তাহার নামটি আরবী। এ কথা কোনও বৈজ্ঞানিক বলেন নাই যে মধ্য-যুগে সহসা কেহ বিদেশ হইতে বুলবুল অানয়ন করিয়া ছাড়িয়া দেন এবং গত চার-পাঁচ শত বৎসরে সারা দেশকে সে ছাইয়া ফেলিয়াছে। বাহান্ন-তিপান্ন রকমের বুলবুল ভারতবর্ষে বাস করে, সুতরাং ওরূপ দাবী কেহ করিতে পারে না। সুতরাং এই পাখী নিশ্চয়ই কালিদাসের সময়েও ছিল—কিন্তু কালিদাসের সাহিত্যে তাহার নাম নাই কেন? থাকিলেও কি নামে আছে? শ্রীযুক্ত সত্যচরণ লাহা মহাশয় কালিদাসের সাহিত্য তন্ন তন্ন করিয়া ঘাঁটিয়া তন্মধ্যে যতগুলি পাখীর নাম পাওয়া যায় তাহার ফিরিস্তি করিয়া উহাদের আধুনিক পরিচয় দিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু তিনিও সংস্কৃত সাহিত্যে বুলবুলকে আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। এতখানি যুক্তির জঞ্জাল সৃষ্টি করিতে হইল এই জন্য যে আমার মতে এই পাখীর নামের বানান বাংলায় “শ্যামা” না হইয়া “শামা” হওয়া উচিত।

 শামার দেহে বর্ণসমাবেশ অনেকটা দোয়েলের মত। ইহার মাথা, গলা, ঘাড়, পিঠ ও বুক চিকণ কালো। দেহের নিম্নভাগ দোয়েলের যেখানে সাদা, ইহাদের সেখানে উজ্জ্বল খয়ের বর্ণ—ইংরাজীতে যাহাকে বলে চেষ্টনাট। জঙ্ঘা দুটি সাদা। দেহের উপর দিকে পুচ্ছটি যেখানে আরম্ভ হইয়াছে সেখানটা ও তাহারই নিম্নদিকে, অর্থাৎ বস্তি-প্রদেশ, ফেনশুভ্র। উত্তেজিত হইলে উপরদিকের হ্রস্ব শুভ্র পালকগুলি ফুলিয়া খুব সুন্দর দেখায়। ডানার পালকগুলি ঘন বাদামী। শামার পুচ্ছটি শুধু দেখিতে সুশ্রী নয়, ইহার দেহের একটা বিশেষ অঙ্গ, কেননা আসল শরীর অপেক্ষা পুচ্ছটি দীর্ঘ এবং দোয়েলের মতই ক্ষণে ক্ষণে ইহাকে উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত করিয়া মিলিটারী ভঙ্গী করা ইহারও স্বভাব। লেজের মধ্য-পালক দুটি দীর্ঘতম, তৎপর দুই পারে পালকগুলি ক্রমশঃ হ্রস্বতর হইয়াছে। মাঝখানের দুই জোড়া পুচ্ছ-পালক সম্পূর্ণ কৃষ্ণবর্ণ। অপর গুলির অগ্রভাগ শুভ্র এবং বাহিরের দিকের পতত্রগুলি প্রায় সম্পূর্ণ শামা শুভ্র। যখন পুচ্ছটি গুটাইয়া রাখে তখন মনে হয় দুই পার্শ্বে দুইটি সাদা রেখা পড়িয়া আছে।

 গভীর অরণ্যানীমধ্যে ইহার বাস বলিয়া বাংলা দেশের বেশীর ভাগ অঞ্চলে ইহাকে পাওয়া যায় না। তবে মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার যে অংশ ছোটনাগপুরের পাশে সেই সব স্থানে, আসাম-প্রান্তে কতকগুলি স্থানে এবং হিমালয়ের পাদমূলের যে অংশ বাংলার মধ্যে পড়িয়াছে সে সব স্থানে ইহাকে নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের সমস্ত অরণ্যপ্রদেশেই একে পাওয়া যায়—সিংহল দ্বীপ পর্য্যন্ত।

 শুধু যে গভীর অরণ্যেই ইহারা বাস করে তাহা নহে। দোয়েলের মত বৃক্ষচুড়ায় বা ঐরূপ উন্মুক্ত স্থানেও সে আসে না। অত্যন্ত ঘন পত্রবীথী বা ঝোপের মধ্যেই সে বিচরণ করে, ভূমি হইতে অধিক উর্দ্ধে ওঠে না। কীটভূক পাখী হিসাবে, ভূমির উপর বা তাহার নিকট যে সব কীট পাওয়া যায় তাহাই শিকার করা ইহার অভ্যাস। দোয়েলের মত আগডালে উঠিয়া গান গাওয়া ইহার অভ্যাস নয়। নিম্নশাখায় বসিয়াই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠধারা দ্বারা সে বনানী মুখরিত করে—কিন্তু সামান্য শব্দেই চমকিত হইয়া মুহূর্ত্তমধ্যে ঘন পত্রান্তরালে আত্মগোপন করে। দোয়েলের মত সপ্রতিভ সে আদৌ নহে। অথচ আশ্চর্য্যের বিষয়, খাঁচায় যখন বন্দী হয় তখন ইহার সব সঙ্কোচ কাটিয়া যায়। পক্ষিগৃহমধ্যে ইহাকে বেশ সাহসী পাখী হিসাবেই দেখিয়াছি। আরও একটা আশ্চর্য্য এই যে স্বাধীন জীবনে ইহা আমিষাশী—কিন্তু মনুষ্যগৃহে ইহা আমিষ ও নিরামিষ দ্বিবিধ আহারই তৃপ্তি সহকারে গ্রহণ করে।

 দোয়েলের মতই ইহার প্রকৃতি অসামাজিক, দলবদ্ধভাবে থাকে না এবং দোয়েলের মতই স্ত্রীপাখিটিকে প্রজননঋতু ছাড়া অন্য ঋতুতে বেশী কাছে আসিতে দেয় না। স্ত্রীপাখীর গাত্রবর্ণ পুরুষ-পাখীর মত, তবে নিষ্প্রভ ও ঔজ্জ্বল্যহীন।

 স্বাধীন অবস্থাতে দোয়েল মানুষের আশেপাশে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে, গান গায়, খাদ্য অন্বেষণ করে। শামা স্বাধীন অবস্থায় অত্যন্ত ভীরু। হয়তো ঘন পত্রবীথী মধ্যে বসিয়া প্রাণ ঢালিয়া গান করিতেছে, একটু কোথাও শব্দ হইল, অমনি অর্দ্ধপথে সঙ্গীত থামাইয়া শব্দের বিপরীত দিকে অন্ধের মত ছুট দেয়। অথচ এই পাখী যখন মানুষের গৃহে আসিয়া খাঁচার মধ্যে আশ্রয় পায়, তখন মানুষের সান্নিধ্যে একটুও বিচলিত হয় না। ইহাদের স্ত্রীপাখিটিও পতির নিঃশব্দ সঙ্গিনী। প্রজনন-ঋতুতে পুরুষশামা অপর পুরুষশামা কাছে দেখিলে অগ্নিশর্মা ও মারমুখো হইয়া উঠে। শ্রীযুক্ত সত্যচরণ লাহার পক্ষীগৃহে অনেক সময় আমরা প্রবেশ করিয়া শামাকে আহার দিতাম, খড়কুটা আগাইয়া দিতাম নীড় রচনার জন্য। সেই সময় আমি শামার শীষ অনুকরণ করিতাম: আমার শীষ শুনামাত্র পুরুষপাখী চঞ্চল হইয়া উঠিত। সে মনে করিত যে স্ত্রীশামাটির আর একজন বুঝি প্রণয়প্রার্থী আসিয়াছে। শেষে যখন বুঝিত যে আমারই শরীর অভ্যন্তর হইতে এই ধ্বনি উত্থিত হইতেছে তখন এই ঈর্ষান্বিত পাখী ভয় ত্যাগ করিয়া আমার মস্তকে ছোঁ মারিয়া চঞ্চুপুটে আঘাত হানিত।

 আশ্চর্য্যের বিষয় গভীর জঙ্গলবাসী এই পাখী, পক্ষিগৃহে নীড় রচনা ও সন্তান উৎপাদন করে। মুক্ত অবস্থায় বৃক্ষকোটরে নীড় রচনা করে। ভূমি হইতে দুই ফুট হইতে কুড়ি ফুট উর্দ্ধ পর্য্যন্ত ইহার নীড় তৈরী করে। অনেক সময় অন্য পাখীর পরিত্যক্ত কোটরও ইহারা বাছিয়া লয়। গর্ত্তটিতে তিন ইঞ্চি পুরু শুকনা পাতার গদি তৈয়ারী করিয়া তদুপরি ছোট ছোট কাঠি পাতিয়া তৃণদ্বারা আস্তৃত করিয়া নীড় তৈরী করে। তদুপরি গোটা চারেক ডিম্ব দেখিতে পাওয়া যায়। এই ডিমগুলি ক্ষুদ্র, সম্পূর্ণ গোলাকৃতি নয়—ডিমের রঙ ফিকে সবুজের উপর গাঢ় বাদামী অর্থাৎ লালচে ছিটে—ছিটেগুলি স্থানে স্থানে ঘনসন্নিবিষ্ট।

 এদেশে এখনও যাহাদের আমরা নিম্নশ্রেণী বলি তাহারা ইহাকে খাঁচায় পোষে। খাঁচাটি সর্ব্বদাই কাপড়ে ঢাকিয়া রাখে। ধনীরা ইহাকে পূর্ব্বে রাখিতেন। গাছপালাযুক্ত পক্ষিগৃহে ইহাকে রাখিলে, ইহারা আনন্দেই থাকে এবং স্ত্রীসহচর পাইলে নীড় রচনা ও সন্তান উৎপাদন করিয়া থাকে দেখিয়াছি।