বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী/মহত্ত্ব ও মিতাচার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ॥ মহত্ত্ব ও মিতাচার

 কোন বিষয়েরই আতিশয্য বাঞ্ছনীয় নহে। সামঞ্জস্য রক্ষা করা প্রাকৃতিক নিয়মের এক প্রধান লক্ষণ। সমঞ্জসীভূত উন্নতি সাধনই মানব জীবনের লক্ষ্য হওয়া কর্ত্তব্য। সুপ্রসিদ্ধ প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানবেত্তা অরিস্ততল মিতাচারকেই ধর্ম্ম বলিয়া গিয়াছেন। তাঁহার মতে সকল বিষয়ের মধ্যম ভাবই ধর্ম্ম। কি শারীরিক স্বাস্থ্যবিধান, কি ধর্ম্মপার্জ্জন, কি খ্যাতিলাভ, কি ন্যায়ানুগত কর্ম্মবিধান, কোনও বিষয় মিতাচার ব্যতিরেকে সুসম্পন্ন হয় না। মিতাচারী, তাঁহার ক্ষোভের কারণ অতি অল্প, তাঁহার হৃদয় প্রায়ই শান্তিরসাভিষিক্ত, তাঁহার মন সর্ব্বদাই প্রফুল্ল, তাঁহার শরীর সুস্থ ও কার্য্যক্ষম।

 উচ্চাভিলাষ, মনস্বিতা, সাহস, শৌর্য্য, দয়া প্রভৃতি মনের উচ্চতাবসকল মহত্ত্বের প্রকৃষ্ট উপাদান বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া থাকে। যেখানে মহত্ত্বের উপাসনা, সেইখানেই প্রীতি ও ভক্তি বিরাজমান। এই প্রীতি ভক্তিই পরার্থে আত্মশাসন ও পরার্ধে আত্মসুখ বিসর্জ্জন শিক্ষা দেয়। আবার মহত্ত্বের এই দুই মূল মন্ত্রের মূলেই মিতাচার বিদ্যমান রহিয়াছে। সুতরাং মহত্ত্ব ও মিতাচার আপাততঃ পরস্পর বিভিন্ন বিষয় বলিয়া বিবেচিত হইলেও মূলে এতদুভয় বিশেষ রূপ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ। ভগবতী দেবীর জীবনে আমরা যে মহত্ত্বের পরিচয় পাই, তাহার মূলে কি পরিমাণে মিতাচার বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহাই আমাদের বর্ত্তমান অধ্যায়ের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

 ভগবতী দেবীর অন্নদান ব্যাপার তাঁহার নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়ার মধ্যেই পরিগণিত হইয়াছিল। কিন্তু তিনি কখন যোড়শোপচারে অন্নদানের ব্যবস্থা করিতে যত্নবতী হন নাই। তিনি যেন ইহা উপলদ্ধি করিতে পারিয়াছিলেন যে, দশজনকে ষোড়শোপচারে ভোজন করান অপেক্ষা, সেই ব্যয়ে বিংশতি জনকে অন্নদান করিতে পারিলে, অন্নদানের সদ্ব্যবহার হইবে। সুতরাং সামান্য গৃহস্থ গৃহে যেরূপ আহারাদির ব্যবস্থা হওয়া সম্ভব, তিনি কখনই অতিরিক্ত আয়োজন করিতে প্রয়াস পান নাই।

 মধ্যাহ্নে ও সায়াহ্নে প্রায় শতাধিক লোক গৃহে ভোজন করিত। ইহাদিগের আহার্য্য রন্ধন ও পরিবেশনাদি ব্যাপারে পাচকাদি নিয়োগ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচারিণী ছিলেন। তিনি মনে করিতেন, ঐরূপ বাবস্থা করিলে যে অর্থব্যয় হইবে, তদ্বারা তিনি আরও কয়েকজনকে অন্নদান করিতে পারিবেন। এইজন্য তিনি স্বয়ং রন্ধন ও পরিবেশনাদি করিতেন। পরিবারস্থ সকলে তাহার সাহায্য করিতেন মাত্র।

 পরিবারস্থ জনগণের বিলাসিতা ও সুুখস্বচ্ছন্দতার জন্য অধিক ব্যয় করা তাঁহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল। তিনি তদ্বিনিময়ে অপরের সুখবিধান করিতে পারিলেই আপনাকে কৃতার্থ মনে করতেন। তিনি স্বয়ং চরকায় সুতা কাটিয়া তদ্বারা মোটা বস্ত্র প্রস্তুত করাইয়া পরিবারস্থ সকলের পরিধানের নিমিত্ত দিতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় কোন সময়ে কলিকাতা হইতে সূক্ষ্ম বস্ত্র পাঠাইয়া দিলে, তিনি তাহা অপরকে বিতরণ করিতেন। আমরা পূর্ব্বেই উল্লেখ করিয়াছি, তিনি অলঙ্কারাদির সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। তিনি বলিতেন, ‘অলঙ্কারাদি ব্যবহার করিলে পরিবারস্থ স্ত্রীলোকদিগের মধ্যে বিলাসিতা বৃদ্ধি পাইবে, গহস্থালীতে তাহাদের আর সেরূপ মন থাকিবে না। বাটীতে দস্যুু তস্করের ভয় হইবে। যে অর্থে অলঙ্কারাদি প্রস্তুত করাইব, সেই ব্যয়ে আমি দশজনকে অন্নদান করিতে পারিব।”

 “দ্রব্যের অপচয় সম্পত্তিসঞ্চয়ের বিরোধী, সকল দ্রব্য হইতেই কোন না কোন প্রয়োজন সাধিত হইতে পারে, এইজন্য তিনি অতি সামান্য দ্রব্যও সযত্নে রক্ষা করিতেন। গৃৃহসামগ্রীসকল বিশৃঙ্খল করিয়া রাখা সম্পত্তিরক্ষা ও সম্পত্তিবৃদ্ধির প্রতিকূল; গৃহ এবং গৃহস্থিত দব্যাদি শীঘ্র বিনষ্ট হইতে দিলে সত্বরই ধনক্ষয় হয়, এইজন তিনি সর্ব্বাগ্রে গৃহের যাবতীয় বিষয়ের শঙ্খলা স্থাপন করিতেন, —ভগবতী দেবীর পারিবারিক জীবনে এ কথা আমরা পূর্ব্বেই উল্লেখ করিয়াছি। ছিন্ন বস্ত্র, এক গাছি রজ্জু, ভগ্ন মৃৃন্ময় পাত্র, একগাছি তৃণ পর্যন্তও তিনি সযত্নে রক্ষা করিতেন। তিনি সর্ব্বদাই বলিতেন, “যাকে রাখ সেই রাখে।” ফলতঃ মিতাচারের এই নীতিসূত্র আমরা প্রত্যেক মহতী নারীর জীবনেই দেখিতে পাই। পুণ্যবতী, করুণার মুর্ত্তি, মহারাণী ভিক্টোরিয়ার জীবনেও আমরা এই নীতিসূত্রের পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া থাকি। সামান্য দ্রব্যটি পর্যন্ত মহারাণী অতিশয় যত্ন সহকারে রক্ষা করিতেন। তাঁহার নিকট নানাস্থান হইতে নানাপ্রকার উপহার প্রেরিত হইত। ঐ সকল উপহার উৎকৃষ্ট ফিতা বা সূতা দ্বারা বাঁধা থাকিত। মহারাণী ঐ সকল ফিতা ও সূতা যত্ন করিয়া তুলিয়া রাখিতেন। তাঁহার পরলোক গমনের পর ঐ সকল সূতা ও ফিতার মূল্য ১১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ধার্য্য হইয়াছিল। যাঁহার রাজ্যে কখন সূর্য্যাস্ত হয় না, সেই প্রবল প্রতাপান্বিতা, ইংলণ্ডের সৌভাগ্যলক্ষ্মী, রাজরাজেশ্বরী, পূণ্যশীলা ভিক্টোরিয়া যখন মিতাচারিণী ছিলেন, তখন আমাদের সামান্য গৃৃহস্থ গৃহে কিরূপ মিতাচার অবলম্বনের প্রয়োজন, পাঠকগণ, একবার ধীরচিত্তে এ বিষয়ে পর্য্যালোচনা করিবেন।

 যে সকল বালক গৃহে ভোজন করিয়া বীরসিংহ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিত, তাহাদের ভোজনাতে উচ্ছিষ্ট অন্ন পাত্রে পরিত্যক্ত থাকিত। ভগবতী দেবী কন্যাদিগকে সেই সকল উচ্ছিষ্ট অন্ন যত্ন সহকারে রক্ষা করিতে বলিতেন। এবং পরিশেষে তিনি পরম সন্তোষপূর্ব্বক সেই সকল অন্ন ভোজন করিতেন। এইরূপে অনেকদিন ঐ উচ্ছিষ্ট অন্ন দ্বারাই তাহার উদরপূর্ত্তি হইত। তাঁহার দেবী চরিত্রের আখ্যায়িকা যতই পর্যালোচনা করা যায়, ততই উপলদ্ধি করা যায় যে, তাঁহার পথে আত্মশাসন ও পরার্থে আত্মসুখ বিসর্জ্জনের মূলে মিতাচারই, বিদ্যমান ছিল।