বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/পরিশিষ্ট (গ)

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পরিশিষ্ট—(গ)

আজাদ হিন্দ গভর্ণমেন্টের ঘোষণা

(শোনান, ২১শে অক্টোবর, ১৯৪৩ সাল)

 ১৭৫৭ সালে বাঙ্গালা দেশে বৃটিশের হাতে প্রথম পরাজয়ের পর ভারতীয় জনগণ একশত বৎসর ধরিয়া অবিশ্রান্তভাবে প্রচণ্ড সংগ্রাম করিয়াছে। এই সময়কার ইতিহাস অতুলনীয় বীরত্ব এবং আত্মত্যাগের বহু দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সিরাজদ্দৌলা, বাঙ্গলার মোহনলাল, হায়দরআলী, টিপু সুলতান দক্ষিণ ভারতের ভেলুতাম্পি, আপ্পা সাহেব ভোঁস্‌লা, মহারাষ্ট্রের পেশোয়া বাজীরাও, অযোধ্যার বেগম, পাঞ্জাবের সর্দ্দার শ্যাম সিংহ আতিরিওয়ালা, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া টোপি, দুমরাওনের মহারাজ কুনোয়ার সিং, নানা সাহেব আরও বহু বীরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রহিয়াছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের পিতৃপুরুষগণ প্রথমে বুঝিতে পারেন নাই যে, বৃটিশ সমগ্র ভারত গ্রাস করিতে উদ্যত হইয়াছে। কাজেই তাঁহারা সম্মিলিতভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন্ নাই। পরিশেষে যখন ভারতীয় জনগণ অবস্থার গুরুত্ব বুঝিতে পারিল তখন তাহারা সম্মিলিত হইল। ১৮৫৭ সালে বাহাদুর সাহের অধিনায়কত্বে তাহারা স্বাধীন জাতি হিসাবে শেষ সংগ্রাম করিল। যুদ্ধের প্রথমভাগে কয়েকটি জয়লাভ সত্ত্বেও দূর্ভাগ্য এবং ভ্রান্ত নেতৃত্ব ধীরে ধীরে তাহাদের চরম পরাজয় ও পরাধীনতা আনিয়া দিল। তথাপি ঝাঁসির রাণী, তাঁতিয়া টোপি, কুনোয়ার সিং এবং নানা সাহেব জাতির গগনে চিরন্তন নক্ষত্রের ন্যায় জ্যোতিষ্মান থাকিয়া আমাদিগকে আরও আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার প্রেরণা দিবে।

 ১৮৫৭ সালের পর বৃটিশরা সবলে ভারতীয়দের নিরস্ত্র করিয়া দেয় এবং আতঙ্ক ও পাশবিকতার রাজত্ব সৃষ্টি করে। ইহার পর কিছুদিন ভারতবাসী হতমান এবং হতবাক হইয়াছিল। ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পর ভারতের নব জাগরণ হইল। ১৮৮৫ সাল হইতে প্রথম মহাযুদ্ধ পর্য্যন্ত ভারতীয় জনগণ তাহাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন, প্রচারকার্য্য, বৃটিশ দ্রব্য বর্জ্জন, সন্ত্রাসবাদ, ধ্বংসাত্বক আন্দোলন প্রভৃতি সর্ব্ব উপায় এবং অবশেষে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ গ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু সবই সাময়িকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অবশেষে ১৯২০ সালে ব্যর্থতার গ্লানিতে আচ্ছন্ন হইয়া ভারতবাসী যখন নূতন পন্থার সন্ধান করিতেছিল, তখন মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলনের নূতন অস্ত্র লইয়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হইলেন।

 ইহার পর ২০ বৎসরকাল ভারতীয়গণ নানা প্রকার দেশপ্রেমমূলক কার্য করে। মুক্তির বার্ত্তা ভারতের ঘরে ঘরে গিয়া পৌঁছায়। ভারতবাসী স্বাধীনতার জন্য নির্যাতন বরণ করিতে শিখিল, আত্মত্যাগ করিতে শিখিল এবং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতে শিখিল। কেন্দ্র হইতে সুদূরবর্ত্তী গ্রাম পর্য্যন্ত জনগণ একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সমবেত হইল। এইভাবে ভারত শুধু রাজনৈতিক চেতনাই লাভ করিল না, তাহারা আবার একটি অখণ্ড রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হইল। ইহার পর তাহারা একস্বরে কথা বলিতে পারিল এবং এক সাধারণ লক্ষ্যের জন্য এক মনে একপ্রাণে সংগ্রাম করিতে পারিল। ১৯৩৭ হইতে ১৯৩৯ সাল পর্য্যন্ত আটটি প্রদেশে কংগ্রেসের মন্ত্রিমণ্ডলের কাজের দ্বারা ভারতীয় জনগণ প্রমাণ দিল যে, তাহারা প্রস্তুত, তাহাদের নিজেদের শাসন-ব্যবস্থা নিজেদের করিবার ক্ষমতা তাহারা অর্জ্জন করিয়াছে।

 এইভাবে বর্ত্তমান মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে ভারতের মুক্তির শেষ সংগ্রামের ভূমি প্রস্তুত হইল। এই যুদ্ধের সময় জার্ম্মাণী তাহার মিত্রদের সহায়তায় ইউয়োপে আমাদের শত্রুদের উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। এদিকে জাপান তাহার মিত্রদের সহায়তায় পূর্ব এশিয়ায় আমাদের শত্রুর উপর প্রবল আঘাত করে। বিভিন্ন অবস্থার সমন্বয়ে ভারতীয় জনগণ তাহাদের জাতীয় মুক্তি অর্জ্জনের অভূতপূর্ব্ব সুযোগ পাইয়াছে।

 বিদেশে ভারতীয়গণ রাজনৈতিক চেতনালাভ করিয়াছে এবং একটি প্রতিষ্ঠানে সঙ্ঘবদ্ধ হইয়াছে। ভারতের ইতিহাসে ইহা নূতন ঘটনা; তাহারা শুধু স্বদেশে তাহাদের দেশবাসীর সহিত সমানভাবে চিন্তা করিতেছে না, স্বাধীনতার পথ ধরিয়া তাহারা তাহাদের সহিত একতালে চলিতেছে। পূর্ব্ব এশিয়ায় আজ ২০ লক্ষাধিক ভারতীয় এক সুসংবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত হইয়াছে। তাহারা ‘পূর্ণ সমরায়োজন’ ধ্বনিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছে। তাহাদের সম্মুখে রহিয়াছে ভারতের আজাদী ফৌজ, তাহাদের মুখে এক কথা ‘দিল্লী চলো’।

 ভণ্ডামির দ্বারা ভারতীয়দের হতাশাচ্ছন্ন করিয়া দিয়া, লুটতরাজ করিয়া তাহাদিগকে অনাহার ও মৃত্যুর পথে ঠেলিয়া দিয়া ব্রিটিশ শাসকগণ ভারতীয়দের শুভেচ্ছা হইতে বঞ্চিত হইয়াছে, এক্ষণে তাহাদের অবস্থা বিশেষ সঙ্কটজনক। সেই অস্বস্তিকর শাসনের শেষ চিহ্ণটির মূলোৎপাটন করিবার জন্য একটিমাত্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গের প্রয়োজন হইবে। সেই স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করিবার ভার আজাদী ফৌজের উপর। স্বদেশে অসামরিক জনগণেরও ব্রিটিশ সরকার গঠিত ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর বহু লোকের সমর্থনে ও আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া ভারতীয় আজাদী ফৌজ তাহাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সাফল্যের সহিত অভিনয় করিবে বলিয়া বিশ্বাস করে।

 পূর্ব্ব এশিয়ায় ভারতীয় স্বাধীনতা সঙ্ঘ এক্ষণে আজাদ হিন্দের অস্থায়ী গবর্ণমেন্ট গঠন করিয়াছেন। এখন আমরা আমাদের পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞান লইয়া কর্ত্তব্যে অবতীর্ণ হইতেছি। ভগবানের নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি আমাদের কার্য এবং মাতৃভুমির মুক্তির জন্য আমাদের সংগ্রাম তাঁহার আশীর্ব্বাদমণ্ডিত করুন। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য, মঙ্গলের জন্য এবং বিশ্বের দরবারে তাঁহাকে উন্নীত করিবার জন্য আমরা আমাদের এবং সঙ্গী ও সহকর্মীদের জীবন পণ করিতেছি।

 অস্থায়ী গভর্ণমেন্টের প্রধান কর্ত্তব্য হইল ভারতভূমি হইতে ব্রিটিশ ও তাহার মিত্রদের বিতাড়িত করিবার জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করা। ইহার পর অস্থায়ী গভর্ণমেন্টের কর্ত্তব্য, জনগণের ইচ্ছা অনুসারে এবং তাহাদের বিশ্বাসভাজন স্থায়ী জাতীয় গভর্ণমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা। ব্রিটিশ এবং তাহার মিত্রবর্গ বিতাড়িত হইবার পর যতদিন পর্য্যন্ত স্থায়ী জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত না হইবে ততদিন অস্থায়ী গভর্ণমেন্ট জনগণের পরিপূর্ণ বিশ্বাসভাজন হইয়া দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করিবে।

 অস্থায়ী গভর্ণমেন্ট প্রত্যেক ভারতীয়ের আনুগত্য দাবী করে এবং আনুগত্য লাভ করিবার সম্পূর্ণ যােগ্য। এই গভর্ণমেণ্ট ধর্মগত স্বাধীনতা এবং সমস্ত অধিবাসীর জন্য সমান অধিকার ও সমান সুযােগ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিতেছে। এই গভর্ণমেণ্ট ঘোষণা করিতেছে যে, দেশের সমস্ত সন্তানকে সমানভাবে পােষণ করিয়া এবং বিদেশী গবর্ণমেন্ট সৃষ্ট সর্বপ্রকার বিভেদ অতিক্রম করিয়া ইহা সমগ্র দেশের এবং সমস্ত অংশের সুখসমৃদ্ধি বিধানের পথে চলিতে দৃঢ়সঙ্কল্প।

 ভগবানের নামে, অতীতে যাঁহারা ভারতীয় জনগণকে সঙ্ঘবদ্ধ করিয়া গেছেন তাঁহাদের নামে, এবং পরলােকগত যে সকল শহীদ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের দ্বারা আমাদের সম্মুখে মহান্ আদর্শ স্থাপন করিয়া গেছেন তাহাদের নামে আমরা ভারতীয় জনগণকে আমাদের গর্বোন্নত পতাকাতলে সমবেত হইতে এবং স্বাধীনতা লাভের জন্য অস্ত্র ধারণ করিতে আহ্বান জানাইতেছি। ব্রিটীশ এবং তাহার সমস্ত মিত্রদের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত সংগ্রাম আরম্ভ করিবার জন্য আমরা তাহাদের আহ্বান করিতেছি। যতদিন পর্য্যন্ত না শত্রু ভারতভূমি হইতে চিরতরে বহিষ্কৃত হয় এবং যতদিন না ভারতবাসী আবার স্বাধীন হয় ততদিন পর্য্যন্ত এই সংগ্রাম অনমনীয় সাহস, অবিচলিত অধ্যবসায় ও পরিপূর্ণ জয়লাভের প্রত্যয় নিয়া চলিতে থাকিবে।

আজাদ হিন্দ গভর্ণমেন্টের সদস্যগণ

 ১। শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু—রাষ্ট্রাধিনায়ক, প্রধান মন্ত্রী, পররাষ্ট্র ও যুদ্ধ মন্ত্রী।

 ২। ক্যাপ্টেন মিস্ লক্ষ্মী—নারী সংগঠন।

 ৩। মিঃ এস্ এ আয়েঙ্গার—প্রচার।

 ৪। লেঃ কঃ এ সি চ্যাটার্জ্জি—অর্থ।

 ৫। লেঃ কঃ আজিজ্ আমেদ, ৬। লেঃ কঃ এন্ এস্ ভগৎ, ৭। লেঃ কঃ জে কে ভোঁস্‌লে, ৮। লেঃ কঃ গুলজারা সিং, ৯। লেঃ কঃ এম্‌ জেড্ কিয়ানী, ১০। লেঃ কঃ এ পি লােকনাথন, ১১। লেঃ কঃ ঈশান কাদির, ১২। লেঃ কঃ শা’নওয়াজ—সেনা বাহিনীর প্রতিনিধি,

 ১৩। মিঃ এ এম সহায়—সম্পাদক (মন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন),

 ১৪। শ্রীযুক্ত রাস বিহারী বসু—সর্ব্বোচ্চ পরামর্শদাতা,

 ১৫। মঃ করিম গণি, ১৬। শ্রীদেবেনাথ দাস, ১৭। মঃ ডি এম্ খান ১৮। মিঃ এ ইয়েলাপ্পা, ১৯। মিঃ আই থিবি, ২০। সর্দ্দার ঈশ্বর সিং—(পরামর্শদাতা),

 ২১। মিঃ এ এন্ সরকার—আইন বিষয়ক পরামর্শদাতা।