বেওয়ারিশ লাস/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

 চাপরাশি ও মেহের আলির সহিত এইরূপ কথা হইতে হইতে আমাদিগের গাড়ি আসিয়া যে স্থানে মৃতদেহ রক্ষিত ছিল, সেই স্থানে উপস্থিত হইল।

 আমরা গাড়ি হইতে অবতরণ করিয়া, মেহের আলি এবং চাপরাশিকে সঙ্গে লইয়া সেই মৃতদেহের সন্নিকটে গমন করিলাম। সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত তাহাদিগকে কহিলাম। মেহের আলি সেই মৃতদেহের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়াই কহিল, “না মহাশয়! এ কাহার দেহ, তাহা আমি চিনিতে পারিতেছি না।”

 চাপরাশি। তাহা আর চিনিতে পারিবে কেন? তোমার জামাতাকে যে কখনও দেখিয়াছে, সে-ই এই মৃতদেহ চিনিতে পারিবে। কিন্তু তুমি চিনিতে পারিতেছ না, ইহা অপেক্ষা আশ্চর্য্যের বিষয় আর কি হইতে পারে?

 যে স্থানে মৃতদেহটী ছিল, তাহার সন্নিকটেই সেই টিনের বাক্সটী রক্ষিত ছিল। সেই বাক্সটী দেখিয়া চাপরাশি কহিল, ওই বাক্সটী কিসের মহাশয়?”

 আমি। এই বাক্সের ভিতর পূরিয়া এই মৃতদেহটী কোন ব্যক্তি গঙ্গার ধারে রাখিয়া দিয়াছিল।

 চাপরাশি। তবে এই বাক্সের ভিতর ওই লাস পাওয়া যায়?

 আমি। হাঁ।

 চাপরাশি। মেহের আলি যে ঘরে থাকে, সেই ঘরে ঠিক এইরূপ একটী বাক্স ছিল। তাহা এখন সেই স্থানে আছে কি না, তাহা মেহের আলিকে জিজ্ঞাসা করুন দেখি।

 আমি। কি হে মেহের আলি! তুমি যে ঘরে থাক, সেই ঘরে এইরূপ একটী টিনের বাক্স ছিল, তাহা এখন কোথায়? উহা এখন সেই স্থানে আছে কি?

 মেহের আলি। চাপরাশি কেবল মিথ্যা কথা কহিতেছে। যে ঘর আমার দ্বারা অধিকৃত, তাহার ভিতর এরূপ টিনের বাক্স কখনও ছিল না, এখনও নাই।

 চাপরাশি। আমি মিথ্যা কথা কহিতেছি? তোমার ঘরে যে টিনের বাক্স ছিল, তাহা কে না জানে? কুঠীর সমস্ত চাকরই তাহা দেখিয়াছে। তাহাদিগের মধ্যে যাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, সে-ই এ কথা বলিবে। চাকর-বাকরের কথাই বা জিজ্ঞাসা করিতেছি কেন? মনিব—সাহেব স্বয়ং ইহা বলিতে পারিবেন। একদিবস তিনি নিজে ওই বাক্স দেখিয়া, মেহের আলিকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “এ বাক্স কাহার?”

 আমি। তাহাতে মেহের আলি কি উত্তর করিয়াছিল?

 চাপরাশি। তাহাতে মেহের আলি এই কথা কহে যে, “অনেক দিবস হইতে এই বাক্স এই স্থানে পড়িয়া রহিয়াছে।”

 আমি। কেমন মেহের আলি! এই কথা কি প্রকৃত?

 মেহের আলি। না মহাশয়! ইহার সমস্তই মিথ্যা কথা।

 আমি। চাপরাশির সমস্ত কথা যদি মিথ্যা হয়, তাহা হইলে তোমার মঙ্গল। আর যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে জানিও, এই হত্যা তোমা-ব্যতীত আর কাহারও দ্বারা হয় নাই।

 মেহের। সেকি মহাশয়! তাহা হইলে আমি আমার জামাতাকে কি হত্যা করিয়াছি? আপনারা এইরূপ বিশ্বাস করেন?

 আমি। কাজেই বিশ্বাস করিতে হইতেছে। তোমার নিজের কথার ভাবেই বেশ অনুমান হইতেছে, এই হত্যাকাণ্ডে তুমি সম্পূর্ণরূপে অপরাধী। তুমি এখন প্রকৃত কথা কি, তাহা বল দেখি। তাহা হইলে তুমি কতদুর অপরাধে অপরাধী, তাহা আমরা অনায়াসেই বুঝিতে পারিব, ও জানিতে পারিব, এই কার্য্য তুমি ইচ্ছা করিয়া করিয়াছি, কি ক্রোধের বশবর্ত্তী হওয়ায়, এই কার্য্য হঠাৎ তোমার দ্বারা হইয়া গিয়াছে।

 মেহের আলি আমার কথায় আর কোনরূপ উত্তর প্রদান না করিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িল।

 মেহের আলির কন্যা তখন সেই স্থানে উপস্থিত ছিল, আমাদিগের এই সকল কথা শুনিয়া সে কহিল, “বাবা! এ কার্য্য তুমিই করিয়াছ! তা’ বেশ করিয়াছ, নিজের কন্যাকে বিধবা করিয়া পিতার উপযুক্ত কার্য্যই করিয়াছ!” এই বলিয়া সে সেই স্থান হইতে একটু দূরে গিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিল।

 মেহের আলির কথা শুনিয়া ও তাহার অবস্থা দেখিয়া, আমাদিগের মনে স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিল যে, মেহের আলি ব্যতীত এই কার্য্য আর কাহারও দ্বারা হয় নাই। তবে লাস স্থানান্তরিত করিবার সময় অপর কোন ব্যক্তি সাহায্য করিলেও করিতে পারে।

 মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সেই বাক্স ও উহার ভিতর যে ঔষধের শিশি পাওয়া গিয়াছিল, তাহা লইয়া মেহের আলি এবং চাপরাশির সহিত পুনরায় সেই স্কুলে গিয়া উপস্থিত হইলাম।

 সেই স্থানে গিয়া সেই সর্ব্বপ্রধান সাহেবের সহিত প্রথমে সাক্ষাৎ করিলাম এবং যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছিলাম, তাহার সমস্ত ব্যাপার তাঁহার নিকট খুলিয়া বলিলাম। সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া তিনি আমাদিগের সহিত মেহের আলির থাকিবার স্থানে গমন করিলেন ও কহিলেন, “এইরূপ একটা বাক্স আমি এই স্থানে পূর্ব্বে দেখিয়াছিলাম। কিন্তু এখন উহা দেখিতে পাইতেছি না।”

 যে স্থানে সেই বাক্সটী পূর্ব্ব হইতে রক্ষিত ছিল বলিয়া জানা গেল, সেই স্থানটী আমরা উত্তমরূপে দেখিলাম। দেখিয়া স্পষ্টই বোধ হইল, সেই স্থানে অতবড় একটা বাক্স রক্ষিত ছিল, তাহার চিহ্ণ এখন পর্য্যন্তও বর্ত্তমান রহিয়াছে।

 ঔষধের শিশি দেখিয়া সাহেব কহিলেন, “উহাতে যে নাম লেখা আছে, সেই নামের একটী বালক এই স্কুলে পূর্ব্বে পাঠ করিত; কিন্তু এখন স্থানান্তরে গমন করিয়াছে। আবশ্যক হইলে তাহার অনুসন্ধান পাওয়া যাইতে পারিবে।”

 অতঃপর সেই স্থানে অপর চাকরগণের বাসস্থান অনুসন্ধান করিলাম। সাহেব সেই অনুসন্ধানে নিজে আমাদিগকে সাহায্য করিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করিতে করিতেই অল্পে অল্পে আসল কথা বাহির হইয়া পড়িল।

 মেহের আলি যখন দেখিল যে, সকল কথা প্রকাশ হইয়া গেল, তখন সেও সমস্ত কথা স্বীকার করিল। সে যাহা কহিল, তাহার সারমর্ম্ম এইরূপ:—

 “রব্বানি আমার জামাতা। এই স্কুলের ভিতর একখানি ক্ষুদ্র খোলার ঘর সে বাঁধিয়া দেয়, তাহাতে আমার নিকট তাহার কিছু পাওনা থাকে। সেই পাওনা টাকার নিমিত্ত সে আমাকে সর্ব্বদা বিরক্ত করিত, সময় অসময় কিছুই না মানিয়া সর্ব্বদা সে আমার নিকট সেই টাকার তাগাদা করিত, এবং সময় সময় আমাকে কটুবাক্যও কহিত।

 “গত পরশ্ব তারিখের সন্ধ্যার পূর্ব্বে সে এই স্থানে আসিয়া আমার নিকট পুনরায় সেই টাকার তাগাদা করে। আমার নিকট সেই সময় টাকা না থাকায়, আমি উহা তাহাকে দিতে পারি নাই। সুতরাং সে আমার উপর অতিশয় অসন্তুষ্ট হইল, এবং আমাকে গালি প্রদান করিল। আমারও অত্যন্ত ক্রোধের উদ্রেক হওয়াতে আমি তাহাকে কহিলাম, “তুমি আমার ঘরের ভিতর আইস, আমি হিসাব করিয়া তোমার সমস্ত টাকা পরিশোধ করিয়া দিতেছি।” আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া সে যেমন ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল, অমনি আমি তাহার কর্ণমুলে সজোরে এক চপেটাঘাত করিলাম। চড় মারিবামাত্র সে সেই স্থানে পড়িয়া গেল। তাহার উপর আমি তাহাকে দুই চারিটী পদাঘাতও করিয়াছিলাম। পরে দেখিলাম, সে মরিয়া গিয়াছে। তখন আর কোন উপায় না দেখিয়া একখানি চটে উহাকে উত্তমরূপে জড়াইয়া বাঁধিলাম, এবং পরিশেষে এই বাক্সের ভিতর পূরিয়া আমার এই ঘরের ভিতরেই রাখিয়া দিলাম। কিন্তু কোন উপায়ে সেই বাক্স আমি ঘর হইতে বাহির করিয়া লইবার অবকাশ পাইলাম না। ক্রমে রাত্রি প্রভাত হইয়া গেল। সমস্ত দিবস সেই বাক্স আমার ঘরের ভিতরেই ছিল। পরদিবস রাত্রি হইলে একটা কুলীর সাহায্যে আমি সেই বাক্সটি স্কুল হইতে বাহির করিয়া একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ি আনিয়া তাহার উপর রাখিয়া দিলাম, এবং সেই গাড়িতে করিয়া উহা আমি গঙ্গার ধারে লইয়া গেলাম। সেই স্থানে খোলা জেটির ভিতর সেই বাক্সটা রাখিয়া দিয়া, আমি সেই গাড়ি বিদায় করিয়া দিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল যে, কোন গতিতে সেই বাক্সটী গঙ্গাগর্ভে নিক্ষেপ করিব; কিন্তু তাহার সুযোগ করিয়া উঠিবার পূর্ব্বেই একজন চাপরাশি সেই বাক্সটা দেখিতে পাইয়া তাহার নিকট গমন করিল। আমিও ভীত হইয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম।”

 মেহের আলি এইরূপে যাহা আমাদিগের নিকট কহিল, সে আর সে কথার পরিবর্ত্তন করিল না। অনুসন্ধানে যে সকল প্রমাণের সংগ্রহ হইল, তাহাদিগের সাক্ষ্যে এবং মেহের আলির স্বীকারেই দায়রার বিচারে তাহার ফাঁসি হইয়া গেল।

সম্পূর্ণ।


 * জ্যৈষ্ঠ মাসের সংখ্যা,

“ঘর-পোড়া লোক।”

(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)

যন্ত্রস্থ।