বেতালপঞ্চবিংশতি/চতুর্দশ উপাখ্যান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


চতুর্দশ উপাখ্যান

 

বেতাল কহিল মহারাজ

কুসুমবতী নগরীতে সুবিচার নামে রাজা ছিলেন। তাঁহার চন্দ্রপ্রভা নামে অবিবাহিতা দুহিতা ছিল। রমণীয় বসন্তসময় উপস্থিত হইলে রাজকুমারী উপবনবিহারে অভিলাষিণী হইয়া পিতার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাজা সম্মত হইলেন এবং রাজধানীর অনতিদূরে যোজনবিস্তৃত অতি রমণীয় এক উপবন ছিল তাহাতে স্ত্রীলোকের বাসোপযোগিতাসম্পাদনার্থে বহুসংখ্যক লোক প্রেরণ করিলেন। তাহাদিগের তথায় উপস্থিত হইবার পূর্ব্বে বিংশতিবর্ষবয়স্ক অতি রূপবান্‌ মনস্বী নামে বিদেশীয় ব্রাহ্মণকুমার আতপতাপিত ও পথশ্রান্ত হইয়া উপবনমধ্যবর্ত্তী এক নিকুঞ্জমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক স্নিগ্ধ ছায়াতে নিদ্রাগত হইয়াছিল। রাজপরিচারকেরা তথায় উপস্থিত হইয়া আবশ্যক কর্ম্ম সকল সম্পন্ন করিয়া প্রস্থান করিল। দৈবযোগে ঐ ব্রাহ্মণকুমার কাহারও দৃষ্টিপথে পতিত হইল না।

পরে রাজকুমারী স্বীয় সহচরীবর্গ ও পরিচারিকাগণের সহিত তথায় উপস্থিত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে ব্রাহ্মণকুমারের সমীপবর্ত্তিনী হইলেন। ভ্রমণকারিণীদিগের পদশব্দে মনস্বীরও নিদ্রাভঙ্গ হইল। ব্রাহ্মণকুমারের ও রাজকুমারীর চারি চক্ষুঃ একত্র হইলে ব্রাহ্মণকুমার মোহিত ও মূর্চ্ছিত হইয়া ভূতলে পড়িলেন রাজকুমারীও সাত্ত্বিকভাবপ্রভাবে কম্পমানকলেবরা ও বিচেতনপ্রায়া হইলেন। সখীগণ অকস্মাৎ ঈদৃশ অতি বিষম বিষমশরদশা উপস্থিত দেখিয়া মনুষ্যবাহ্য যানে আরোহণ করাইয়া তৎক্ষণাৎ রাজকুমারীকে গৃহে লইয়া গেল। ব্রাহ্মণকুমার সেই স্থানেই স্পন্দন্থীন পতিত রহিলেন।

শশী ও ভূদেব নামে দুই ব্রাহ্মণ কামরূপে বিদ্যা শিক্ষা করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতেছিলেন তাঁহারাও আতপে তাপিত হইয়া বিশ্রামার্থ সেই উপবনের নিকুঞ্জমধ্যে উপস্থিত হইলেন। প্রবেশমাত্র সেই ব্রাহ্মণকুমারকে তদবস্থ পতিত দেখিয়া ভূদেব স্বীয় সহচরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বল দেখি শশী এ এরূপ অচেতন হইয়া পতিত আছে কেন। শশী কহিলেন বোধ করি কোন নায়িকা ভ্রূচাপ দ্বারা কটাক্ষশর প্রহার করিয়াছে তাহাতেই এ এ রূপে পতিত আছে। ভূদেব কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া কহিলেন ইহাকে জাগরিত করিয়া সবিশেষ জিজ্ঞাসা করি।

অনন্তর ভূদেব শশীর নিষেধ না মানিয়া নানাবিধ উপায় দ্বারা তাহার চৈতন্য সম্পাদন করিলেন এবং জিজ্ঞাসিলেন অহে ব্রাহ্মণতনয় কি কারণে তোমার ঈদৃশী দশা ঘটিয়াছে বল। ব্রাহ্মণকুমার কহিলেন যে ব্যক্তি দুঃখ দূর করিতে সমর্থ তাহার অগ্রেই দুঃখের কথা ব্যক্ত করা উচিত। নতুবা অনর্থ ইতস্ততঃ ব্যক্ত করিলে কেবল আপন মূঢ়তামাত্র প্রকাশ পায়। ভূদেব কহিলেন ভাল তুমি আমার অগ্রে ব্যক্ত কর আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে রূপে পারি তোমার দুঃখ দূর করিব। মনস্বী কহিলেন কিয়ৎ ক্ষণ পূর্ব্বে এক রাজকন্যা এই উপবনে ভ্রমণ করিতে আসিয়াছিল তাহাকে দেখিয়া আমার এই দশা ঘটিয়াছে। অধিক কি কহিব তাহাকে না পাইলে আমার প্রাণত্যাগ হইবেক।

তখন ভূদেব কহিলেন তুমি আমার সমভিব্যাহারে চল যাহাতে তোমার মনোরথ সিদ্ধ হয় তদ্বিষয়ে অশেষপ্রকার যত্ন করিব। আর যদি তোমার প্রার্থিতসম্পাদনবিষয়ে নিতান্তই কৃতকার্য্য হইতে না পারি অন্ততঃ বহুসংখ্যক অর্থ দিয়া বিদায় করিব। মনস্বী কহিলেন যদি আমার অভিপ্রেত স্ত্রীরত্নলাভের সদুপায় করিতে পার তোমাদের সমভিব্যাহারে যাই নতুবা ধনের নিমিত্তে আমার কিঞ্চিন্মাত্র স্পৃহা নাই। ভূদেব মনস্বীর এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন এবং অবশ্যই তোমার মনোরথ সম্পন্ন করিব তুমি আমাদের সমভিব্যাহারে চল এই বলিয়া আপন আলয়ে লইয়া গেলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া সর্ব্ব কর্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক অগ্রে তাহাকে এক একাক্ষর মন্ত্র শিখাইয়া দিলেন। কহিলেন তুমি এই মন্ত্র উচ্চারণ করিলে ষোড়শবর্ষীয়া কন্যা হইবে এবং ইচ্ছা করিলেই পুনর্বার আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হইবে।

মনস্বী মন্ত্রবলে ষোড়শবর্ষীয়া কন্যা হইলেন। ভূদেব অশীতিবর্ষদেশীয়ের আকার ধারণ করিলেন এবং মনস্বীকে বধূবেশ ধারণ করাইয়া সঙ্গে লইয়া রাজা সুবিচারের নিকট উপস্থিত হইলেন। রাজা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দর্শনমাত্র গাত্রোত্থান করিয়া প্রণামপূর্ব্বক বসিতে আসন প্রদান করিলেন।

ব্রাহ্মণ আসন পরিগ্রহ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন যিনি এই জগন্মণ্ডল প্রলয়পয়োধিজলে নিলীন হইলে মীনরূপ ধারণ করিয়া ধর্ম্মমূল অপৌরুষেয় বেদের রক্ষা করিয়াছেন যিনি বরাহমূর্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া বিশাল দশনাগ্রভাগ দ্বারা প্রলয়জলনিমগ্ন মেদিনীমণ্ডলের উদ্ধার করিয়াছেন যিনি কূর্ম্মরূপ অবলম্বন করিয়া পৃষ্ঠে এই সসাগরা ধরা ধারণ করিয়া আছেন যিনি নরসিংহ আকার স্বীকার করিয়া নখকুলিশপ্রহার দ্বারা বিষম শত্রু হিরণ্যকশিপুর বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিয়াছেন যিনি দৈত্যরাজ বলিকে ছলিবার নিমিত্ত বামন অবতার হইয়া দেবরাজকে পুনর্বার ত্রিলোকীর ইন্দ্রত্বপদে সংস্থাপিত করিয়াছেন যিনি জমদগ্নির ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া পিতৃবধামর্ষপ্রদীপ্ত হইয়া তীক্ষ্ণধার কুঠার দ্বারা মহাবীর্য্য কার্ত্তবীর্য্য অর্জুনের ভুজবন ছেদন করিয়াছেন এবং একবিংশতি বার পৃথ্বীকে নিঃক্ষত্রিয়া করিয়া অরাতিশোণিতজলে পিতৃতর্পণ করিয়াছেন যিনি দেবতাগণের অভ্যর্থনা অনুসারে দশরথগৃহে অংশচতুষ্টয়ে অবতীর্ণ হইয়া বানরসৈন্য সমভিব্যাহারে সমুদ্রে সেতুবন্ধনপূর্ব্বক দুর্বৃত্ত দশাননের বংশ ধ্বংস করিয়াছেন যিনি দ্দাপরযুগের অন্তে ধর্ম্মসংস্থাপনার্থে যদুবংশে অংশে অবতীর্ণ হইয়া দৈত্যবধ দ্বারা ভূমির ভার হরিয়া অশেষপ্রকার লীলা করিয়াছেন যিনি বেদমাগবিপ্লাবনের নিমিত্ত বুদ্ধাবতার হইয়া দয়ালুত্ব জিতেন্দ্রিয়ত্ব প্রভৃতি সদ্গুণের পরা কষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন যিনি সন্তলগ্রামে বিষ্ণুযশা নামক ধর্ম্মনিষ্ঠ ব্রহ্মপরায়ণ ব্রাহ্মণের ভবনে অবতীর্ণ হইয়া ভুবনমণ্ডলে কল্কীনামে বিখ্যাত হইবেন এবং অতি দ্রুতগামী দেবদত্ত তুরঙ্গমে আরোহণ করিয়া করতলে করাল করবাল ধারণপূর্ব্বক বেদবিদ্বেষী ধর্ম্মমার্গপরিভ্রষ্ট নষ্টমতি দুরাচারদিগের সমুচিত দণ্ড বিধান করিবেন সেই ত্রিলোকীনাথ বৈকুণ্ঠস্বামী ভূতভাবন ভগবান্‌ আপনকার রক্ষা করুন।

রাজা জিজ্ঞাসিলেন মহাশয় কোথা হইতে আসিতেছেন। বৃদ্ধবেশী ভূদেব কহিলেন মহারাজ আমি গঙ্গার পূর্ব্ব পার হইতে আসিতেছি। ইনি আমার পুত্ত্রবধূ। ইঁহাকে ইঁহার পিত্রালয় হইতে আনিতে গিয়াছিলাম প্রত্যাগমন করিয়া দেখিলাম মারীভয়ে গ্রামস্থ সমস্ত লোক স্থানত্যাগ করিয়া দেশান্তরে প্রস্থান করিয়াছে। গৃহে ব্রাহ্মণী ও বিংশতিবর্ষীয় পুত্ত্র রাখিয়া গিয়াছিলাম তাহারাও সেই উপদ্রবের সময় দেশত্যাগ করিয়াছে কোথায় গিয়াছে কিছুই অনুসন্ধান করিতে পারি নাই। জানি না কত স্থান ভ্রমণ করিলে তাহাদিগের দর্শন পাইব। তাহাদের অদর্শনে আমার আহার নিদ্রা পরিত্যাগ হইয়াছে। এক্ষণে মানস করিয়াছি পুত্ত্রবধূকে বিশ্বস্তহস্তে ন্যস্ত করিয়া তাহাদের অন্বেষণে নির্গত হইব। আপনি দেশাধিপ আপন অপেক্ষা বিশ্বাসভাজন কোথায় পাইব। আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত পুত্ত্রবধূটিকে আপনকার অন্তঃপুরে রাখুন।

রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন পরকীয় মহিলা গৃহে রাখা অতি কঠিন কর্ম্ম কিন্তু অস্বীকার করিলে ব্রাহ্মণ মনঃক্ষুণ্ণ হইবেন। অতএব চন্দ্রপ্রভার নিকটে দিয়া তাহার প্রতি ইহার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দি। অনন্তর ব্রাহ্মণকে কহিলেন মহাশয় যাহা আজ্ঞা করিতেছেন তাহাতে আমি সম্মত হইলাম। ভূদেব অত্যন্ত হৃষ্ট চিত্তে আশীর্বাদ প্রয়োগপূর্ব্বক রাজার হস্তে পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। রাজাও অনতিবিলম্বে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া কন্যার হস্তে কন্যাবেশধারী মনস্বীর ভার সমর্পণ করিলেন।

রাজকন্যা ব্রাহ্মণবধূকে সমবয়স্কা দেখিয়া আদরপূর্ব্বক তাহার ভার লইলেন এবং আপন সহোদরার ন্যায় যত্ন ও স্নেহ করিতে লাগিলেন। সর্ব্বদা একত্র উপবেশন একত্র ভোজন ও এক শয্যায় শয়নাদি দ্বারা পরস্পরের প্রণয়সঞ্চার হইতে লাগিল। ফলতঃ মনস্বী ক্রমে ক্রমে রাজকন্যার প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় হইয়া উঠিলেন। এক দিবস তিনি রাজকন্যার মনের ভাবপরীক্ষার্থে কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন প্রিয়সখি তুমি দিবানিশি কি চিন্তা কর এবং কি নিমিত্ত দিনে দিনে দুর্বল হইতেছ বল।

রাজপুত্ত্রী কহিলেন সখি বসন্তকালে এক দিবস সখীগণ সঙ্গে লইয়া বনবিহারে গিয়াছিলাম। তথায় দৈবযোগে এক পরম সুন্দর যুবা ব্রাহ্মণকুমার আমার নয়নপথের পথিক হইলেন। তদবধি তদাসক্তচিত্তা হইয়া তদ্বিরহে দিনে দিনে এরুপ দুর্বল হইতেছি। দুঃসহ বিরাহানল ক্রমে প্রবল হইয়া নিরন্তর অন্তর দাহ করিতেছে। আমার আহার বিহার শয়ন উপবেশন কোন বিষয়েই সুখ নাই। দিবানিশি কেবল সেই মোহনমূর্ত্তি চিন্তা করিয়া প্রাণধারণ করিতেছি এবং চতুর্দিক্‌ তন্ময় দেখিতেছি। তাহার নাম ধাম কিছুই জানি না। ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন উপায় স্থির করিতে পারি নাই। নিতান্ত নির্লজ্জা হইয়া কাহারও নিকট মনের ব্যথা ব্যক্ত করিতে পারি না। তুমি আমার দ্বিতীয় প্রাণ তোমার নিকট কোন কথাই গোপনীয় নাই। তুমি কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করিলে তাহাতেই প্রকাশ করিলাম। ফলতঃ তোমার নিকটে মনের বেদনা বর্ণন করিয়াও অনেক স্বাস্থ্য বোধ হইল। তুমি এ বিষয় অতি গোপনে রাখিবে।

এই রূপে রাজকন্যার অভিপ্রায় বুঝিয়া মনস্বী আনন্দপ্রবাহে মগ্ন হইলেন এবং কহিলেন প্রিয়সখি আমি যদি তোমার প্রিয়সমাগম সম্পন্ন করিতে পারি তবে আমাকে কি পারিতোষিক দাও। রাজকন্যা কহিলেন সখি অধিক কি কহিব যদি তুমি তাহাকে মিলাইয়া দিতে পার তোমার দাসী হইয়া চির কাল চরণসেবা করিব। মনস্বী তৎক্ষণাৎ আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক রাজকুমারীর করগ্রহণ করিলেন। রাজকন্যা এইরূপ অসম্ভাবিত প্রিয়সমাগম দ্বারা মনোরথনদীর পার প্রাপ্ত হইয়া প্রথমতঃ বাক্‌পথাতীত হর্ষ বিস্ময় লজ্জার উদ্রেক সহকারে পরম রমণীয় অনির্বচনীয় দশান্তর প্রাপ্ত হইলেন। অনন্তর লজ্জাভঙ্গ হইলে এই রূপান্তরপ্রতিপত্তিরূপ অদ্ভুত ব্যাপারের নিগূঢ়তত্ত্ববোধার্থে কৌতুকাবিষ্ট হইয়া সবিশেষ কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। মনস্বী আপন বিচেতনদশা অবধি ভূদেবের তিরস্করণীবিদ্যাদানপ্রসাদপর্য্যন্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া পরিশেষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া গান্ধর্ব্ববিধান অনুসারে পাণিগ্রহ সমাধান করিলেন।

অল্প দিনের মধ্যেই রাজকুমারী অন্তর্বত্নী হইলেন। এই সময়ে এক দিবস রাজা সুবিচার সপরিবার অমাত্যভবনে নিমন্ত্রিত হইলেন। রাজকন্যা এক নিমিষের নিমিত্তেও ব্রাহ্মণবধূকে নয়নের অন্তরাল করিতেন না। সুতরাং তিনি অমাত্যভবনপ্রস্থানকালে তাহাকে আপন সমভিব্যাহারে লইয়া গেলেন। অমাত্যের পুত্ত্র ব্রহ্মাণবধূর অসামান্যরূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত হইল এবং নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া আপন মিত্রের নিকট কহিল যদি এই নারী হস্তগত না হয় প্রাণত্যাগ করিব। ফলতঃ মন্ত্রিপুত্ত্রের ক্রমে ক্রমে বিরহবেদনা এরূপ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল যে কেবল দশমী দশা মাত্র অবশিষ্ট রহিল।

তখন তাহার মিত্র অন্য কোন উপায় না দেখিয়া অমাত্যের নিকটে গিয়া আপন মিত্রের অবস্থা ও প্রার্থনা ব্যক্ত করিলে তিনি রাজার নিকটে সবিশেষ কহিয়া আপন পুত্ত্রের নিমিত্ত ব্রাহ্মণবধূ প্রার্থনা করিলেন। রাজা শুনিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং কহিলেন অরে মূখ স্থাপিত ধন স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে অন্যকে দেওয়া গর্হিত কর্ম্ম। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ ব্যতিক্রমের সম্ভাবনা নাই ছানিয়া বিশ্বাস করিয়া আমার নিকট পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়া গিয়াছেন সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করা অত্যন্ত নীতিবিরুদ্ধ। আমি তোমার অনুরোধে এরূপ দুষ্ক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হইব না। মন্ত্রী শুনিয়া নিরাশ হইয়া আপন গৃহে গমন করিলেন। কিন্তু পুত্ত্রের তাদৃশী দশা দেখিয়া নিতান্ত কাতর হইয়া আহার নিদ্রা পরিহারপূর্ব্বক বিষাদসমুদ্রে মগ্ন হইলেন।

এই রূপে সর্ব্বাধিকারী ক্রমে ক্রমে পুত্ত্রের তুল্যদশা প্রাপ্ত হইলে রাজকার্য্যব্যাঘাতের উপক্রম দেখিয়া অন্যান্য প্রধান রাজপুরুষেরা রাজার নিকটে নিবেদন করিল মহারাজ মন্ত্রিপুত্ত্রের যেরূপ অবস্থা দেখিতেছি তাহাতে তাহার জীবনরক্ষা হওয়া কঠিন। তাহার কোন অমঙ্গল ঘটিলে মন্ত্রীও প্রাণত্যাগ করিবেন সন্দেহ নাই। এরূপ কর্ম্মদক্ষ কার্য্যসহায় দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই, সুতরাং রাজকার্য্যের অনেক বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবেক। অতএব আমরা সকলে বিনয়বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের পুত্ত্রবধূকে পুত্ত্রের নিকট প্রেরণ করুন। বহু দিবস হইল ব্রাহ্মণের উদ্দেশ নাই আর তাঁহার আসিবার সম্ভাবনা বোধ হয় না। যদিও কালান্তরে প্রত্যাগমন করেন ব্রাহ্মণজাতি অর্থলোভী বহুসংখ্যক অর্থ দিয়া অনায়াসে বিদায় করিতে পারিবেন অথবা কন্যান্তরসঙ্ঘটন করিয়া তাঁহার পুত্ত্রের বিবাহ দিলেও তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবেন।

রাজা নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া ব্রাহ্মণবধুর নিকটে গিয়া মন্ত্রিপুত্ত্রের প্রার্থনা জানাইলেন। কপটচারী মনস্বী নিবেদন করিলেন মহারাজ আপনি দেশাধিপতি বিশেষতঃ এক্ষণে আমি আপনকার আশ্রয়ে আছি। অতএব আপনকার আজ্ঞাপ্রতিপালন করা আমার উচিৎ কর্ম্ম। কিন্তু বিবাহিতনারীর পুরুষান্তরসেবা শাস্ত্রনিষিদ্ধ ও লোকাচারবিরুদ্ধ। আপনি দণ্ডধারী হইয়া কি রূপে ঈদৃশ বিসদৃশ আজ্ঞা করিতেছেন বুঝিতে পারিলাম না। মহারাজ আমি প্রাণান্তেও পরপুরুষের মুখাবলোকন করিব না। রাজা শুনিয়া বিষণ্ণ হতবুদ্ধি ও কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন।

মনস্বী আর এখানে থাকায় ভদ্রস্থতা নাই অতঃপর পলায়ন করাই শ্রেয়ঃ এই স্থির করিয়া বধুবেশ পরিত্যাগপূর্ব্বক কৌশলক্রমে রাজবাটী হইতে পলায়ন করিলেন। রাজা ব্রাহ্মণবধূর অদর্শনবৃত্তান্ত অবগত হইয়া এক বারে সাগরে মগ্ন হইলেন এবং ভাবিতে লাগিলেন এ আবার কি বিষম বিপদ উপস্থিত হইল। ব্রাহ্মণ আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলে কি উত্তর দিব। ফলতঃ ব্রাহ্মণবধূর নিকট এরূপ অনুচিত প্রার্থনা করাই অতি অসঙ্গত কর্ম্ম হইয়াছে। ষদর্থে প্রার্থনা করিলাম তাহাও সিদ্ধ হইল না অথচ ঘোরতর বিপদে পড়িলাম।

এ দিকে মনস্বী ভূদেবের নিকটে আসিয়া পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলে তিনি অত্যন্ত প্রীত ও চমৎকৃত হইলেন এবং স্বীর সহচর শশীকে বিংশতিবর্ষীয় পুত্ত্র সাজাইয়া স্বয়ং পূর্ব্ববৎ বৃদ্ধবেশ ধারণপূর্ব্বক পুত্ত্রবধূর আনয়নার্থে রাজার নিকট গমন করিলেন। রাজা প্রণাম ও স্বাগত প্রশ্ন করিয়া বসিতে আসন দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয়ের এত দিন বিলম্ব হইল কেন। ভুদেব কহিলেন মহারাজ বিলম্বের কথা কেন জিজ্ঞাসা করেন। অনেক কষ্টে অন্বেষণ করিয়া পুত্ত্র পাইয়াছি। এক্ষণে পুত্ত্র পুত্ত্রবধূ লইয়া গৃহে যাইব। রাজা ব্রহ্মশাপভয়ে কম্পিত ও কৃতাঞ্জলি হইয়া ব্রাহ্মণের নিকট সবিশেষ সমস্ত নিবেদন করিলেন।

ব্রাহ্মণ শুনিয়া কোপে কম্পমানকলেবর হইলেন এবং শাপপ্রদানে উদ্যত হইয়া কহিলেন তোমার এ কি ব্যবহার। আমি তোমাকে রাজা জানিয়া বিশ্বাস করিয়া পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়াছিলাম। তুমি আপন ইষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত যথেচ্ছ বিনিয়োগে প্রবৃত্ত হইয়া আমার সর্ব্বনাশ করিয়াছ। বলিতে কি কোন কালে আমার এ মনোবেদনা দূর হইবেক না। রাজা শুনিয়া অত্যন্ত ভীত হইলেন এবং অশেষপ্রকার স্তুতি ও বিনীতি করিয়া কহিলেন মহাশয় কৃপা করিয়া আমার এই অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনকার যে অপকার করিয়াছি তাহার প্রতিক্রিয়ার্থে যাহা আজ্ঞা করিবেন তাহাতেই সম্মত হইব। ভুদেব কহিলেন যদি তুমি আমার পুত্ত্রের সহিত আপন কন্যার বিবাহ দিতে পার তাহা হইলে আমি কথঞ্চিৎ ক্ষমা করিতে পারি।

রাজা ব্রহ্মকোপানলে কুলক্ষয়ভয়ে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন, এবং জ্যোতির্বিদ ব্রাহ্মণ দ্বারা শুভ দিন ও শুভ লগ্ন নির্ণয় করিয়া কন্যার বিবাহ দিলেন। অনন্তর ভূদেব রাজকন্যা লইয়া আলয়ে উপস্থিত হইলে মনস্বী ও শশী উভয়ে এই ভার্য্যা আমার আমার বলিয়া পরস্পর বিবাদ আরম্ভ করিলেন। মনস্বী কহিলেন ইহাকে আমি পূর্ব্বে বিবাহ করিয়াছি এবং আমার সহযোগে ইহার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে। শশী কহিলেন রাজা সর্ব্বসমক্ষে আমাকে কন্যাদান করিয়াছেন।

ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এক্ষণে এই কন্যা শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে কাহার ভার্য্যা হইবেক। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমার মতে মনস্বীর। বেতাল কহিল শাস্ত্রে লিখিত আছে কন্যার দান বিক্রয় পরিত্যাগে পিতা মাতার সম্পূর্ণ অধিকার। রাজা সর্ব্বসমক্ষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া শশীকে কন্যা দান করিয়াছেন। অতএব ঐ পিতৃদত্তা কন্যা শশীরই হইতে পারে তাহা না হইয়া মনস্বীর কেন হয় বল। রাজা কহিলেন তুমি যাহা কহিতেছ তাহার যথার্থতাবিষয়ে আমি অণুমাত্র সংশয় করি না। কিন্তু মনস্বী পূর্ব্বে বিবাহ করিয়াছে এবং তৎসহযোগে রাজকন্যার গর্ভ হইয়াছে। এক্ষণে সে মনস্বীর পত্নী হইলে তাহারও সতীত্ব রক্ষা হয় এবং ধর্ম্মেরও মান থাকে।

ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।