ব্যঙ্গকৌতুক/পয়সার লাঞ্ছনা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


আমাদের আপিসের সাহেব বলে , বাঙালির বেশি বেতনের আবশ্যক নাই । সে স্থির করিয়া রাখিয়াছে , ভদ্র বাঙালির ছেলের পক্ষে মাসিক পঁচিশ টাকা খুব উচ্চ বেতন । আমাদের অবস্থা এবং আমাদের দেশের সম্বন্ধে সাহেবরা যখন একটা মত স্থির করে তখন তাহার উপর আমাদের কোনো কথা বলা প্রগল্‌ভতা । কেবল সাহেবের প্রতি একটা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কুটুম্বিতাসূচক বিশেষণ-প্রয়োগপূর্বক মনের ক্ষোভে আপনা-আপনির মধ্যে বলাবলি করি–সাহেব সবই তো জানেন ।

শোনা যায় জগতে হরণ-পূরণের একটা নিয়ম আছে । সে নিয়মের অর্থ এই–যাহার একটার অভাব তাহার আর-একটার বাহুল্য প্রায়ই থাকে । আপিসেও তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় । আমাদের যেমন বেতন অল্প তেমনি খাটুনি এবং লাঞ্ছনা অধিক এবং সাহেবের ঠিক তাহার বিপরীত ।

কিন্তু জগতের এ নিয়ম কোনো কোনো জগদ্‌বাসীর পক্ষে যেমনই আনন্দজনক হউক আমাদের পক্ষে ঠিক তেমন সুবিধার বোধ হয় নাই । কেবল অগত্যা সহিয়াছিলাম , কিন্তু যেদিন আমাদের উপরে একটা কর্ম খালি হইল এবং বাহির হইতে একটা কাঁচা ইংরাজের ছেলেকে সেই কর্মে নিযুক্ত করিয়া আমাদের প্রমোশন বন্ধ করা হইল , সেদিন আমাদের ক্ষোভের আর সীমা রহিল না । ইচ্ছা হইল তখনই কাজ ফেলিয়া যদি চলিয়া যাই , একটা মিউটিনি করি , ইংরাজকে দেশ হইতে দূর করিয়া দিই , পার্লামেন্টে একটা দরখাস্ত করি , স্টেট্‌স্‌ম্যান কাগজে একটা বেনামি পত্র লিখি । কিন্তু তাহার কোনোটা না করিয়া বাড়িতে চলিয়া গিয়া সেদিন আর জলখাবার খাইলাম না , খোকার সর্দি হইয়াছে বলিয়া স্ত্রীকে যৎপরোনাস্তি লাঞ্ছনা করিলাম , স্ত্রী কাঁদিতে লাগিল , আমি সকাল সকাল শুইয়া পড়িলাম । শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিলাম , হায় রে পয়সা , তোর জন্য এত অপমান!

স্ত্রী অভিমান করিয়া আমার কাছে আসিলেন না , কিন্তু নিঃশব্দচরণে নিদ্রাদেবী আসিয়া উপস্থিত হইলেন । হঠাৎ কখন দেখিতে পাইলাম–আমি একটি পয়সা । কিছু আশ্চর্য বোধ হইল না । কবে কোন্‌ সনাতন টাঁকশাল হইতে বাহির হইয়াছি যেন মনেও নাই । এই পর্যন্ত অবগত আছি যে , ব্রহ্মার পা হইতে যেমন শূদ্রের উৎপত্তি সেইরূপ টাঁকশালের অত্যন্ত নিম্নভাগেই আমাদের জন্ম ।

সেদিন সিকি দু-আনির একটা মহতী সভা বসিবে কাগজে এইরূপ একটা বিজ্ঞাপন পড়া গিয়াছিল । হাতে কাজ ছিল না , কৌতূহলবশত গড়াইয়া গড়াইয়া সেই সভায় গিয়া উপস্থিত হইলাম এবং দেয়ালের কাছে একটা কোণে আশ্রয় লইলাম ।

সুকুমারী সহধর্মিণী দু-আনিকে সযত্নে বামপার্শ্বে লইয়া শুভ্রকায় চার-আনিগুলি দলে দলে আসিয়া সভাগৃহ আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল । তাহারা বাস করে কেহ-বা কোটের পকেটে , কেহ-বা চামড়ার থলিতে , কেহ-বা টিনের বাক্সে । কেহ কেহ-বা অদৃষ্টগতিকে আমাদের প্রতিবেশীরূপে আমাদের পাড়ায় ট্যাঁকের মধ্যেও বদ্ধ হইয়া দিনযাপন করে ।

সেদিনকার আলোচনার বিষয়টা এই যে , আমরা পয়সার সহিত সর্বতোভাবে পৃথক হইতে চাহি , কারণ , উহারা বড়োই হীন। দু-আনিরা সুতীক্ষ্ণ উচ্চস্বরে কহিল, এবং উহারা তাম্রবর্ণ ও উহাদের গন্ধ ভালো নহে । আমার পাশে একটি দু-আনি ছিল , সে ঈষৎ বাঁকিয়া বসিয়া নাসাগ্র কুঞ্চিত করিল, তাহার পার্শ্ববর্তী চার-আনি আমার দিকে কট্‌মট্‌ করিয়া তাকাইল , আমি তো একেবারে সংকোচে সিকিপয়সা হইয়া গেলাম । মনে মনে কহিলাম , আমাদেরই তো আটটা ষোলোটা হজম করিয়া তোমাদের আজ এত মূল্য, সেজন্য কি কিছু কৃতজ্ঞতা নাই ? মাটির নীচে তো উভয়ের সমান পদবী ছিল ।

সেদিন প্রস্তাব হইল গৌরমুদ্রা এবং তাম্রমুদ্রার জন্য স্বতন্ত্র টাঁকশাল স্থাপিত হউক । যদিও এক মহারানীর ছাপ উভয়ের উপর মারা হইয়াছে , তাই বলিয়া কোনোরূপ সাম্য আমরা স্বীকার করিতে চাহি না । আমরা এক ট্যাঁক , এক থলি , এক বাক্সে বাস করিব না । এমন-কি , সিকি দু-আনি ভাঙাইয়া পয়সা করা ও পয়সা ভাঙাইয়া সিকি দু-আনি করা এরূপ অপমানজনক আইনও আমরা পরিবর্তন করিতে চাহি । সাম্যবাদের গৌরব আমরা অস্বীকার করি না , কিন্তু তাহার একটা সীমা আছে । গিনি মোহরের সহিত সিকি দু-আনি এক সাম্যসীমার অন্তর্গত , কিন্তু তাই বলিয়া সিকি দু-আনির সহিত পয়সা!

সকলেই চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল , কখনোই নহে! কখনোই নহে! দু-আনির তীব্র কণ্ঠস্বর সর্ব্বোচ্চে শোনা গেল । যে খনিতে আমার আদিম উৎপত্তি সেই খনির মধ্যে প্রবেশ করিবার ইচ্ছায় আমি বসুমতীকে দ্বিধা হইতে অনুরোধ করিলাম , বসুমতী সে অনুরোধ পালন করিল না–দেয়াল ঘেঁষিয়া রক্তবর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম ।

এমন সময় ঝক্‌ঝকে নূতন সিকি গড়াইয়া এই সিকি দু-আনির সভার মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল । সে দেখিলাম সকলকে ছাড়াইয়া উঠিল । সতেজে বক্তৃতা দিতে লাগিল , ঝন্‌ঝন্‌ শব্দে চারি দিকে করতালি পড়িল ।

কিন্তু আমি ঠাহর করিয়া শুনিলাম , বক্তৃতাটা যেমন হউক আওয়াজটা ঠিক রূপালি ছাঁদের নহে । মনে বড়ো সন্দেহ হইল । সভা যখন ভঙ্গ হইল , ধীরে ধীরে গড়াইয়া গড়াইয়া বহুসাহসপূর্বক তাহার গায়ের উপর গিয়া পড়িলাম–ঠন্‌ করিয়া আওয়াজ হইল , সে আওয়াজটা অত্যন্ত দিশি এবং গন্ধটাও দেখিলাম আমাদের স্বজাতীয়ের মতো । মহা রাগিয়া উঠিয়া সে কহিল , তুমি কোথাকার অসভ্য হে! আমি কহিলাম , বৎস , তুমিও যেখানকার আমিও সেখানকার । ছোঁড়াটা আমাদের নিম্নতম কুটুম্ব–আধ-পয়সা ; কোথা হইতে পারা মাখিয়া আসিয়াছে ।

তাহার রকম-সকম দেখিয়া হা-হাঃ শব্দে হাসিয়া উঠিলাম ।

হাসির শব্দে জাগিয়া উঠিয়া দেখি , স্ত্রী পাশে শুইয়া কাঁদিতেছে । তৎক্ষণাৎ তাহার সঙ্গে ভাব করিয়া লইলাম । ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বিবৃত করিয়া বলিলাম , বড়ো ধরা পড়িয়াছে! কিন্তু মনে করিতেছি আমিও কাল হইতে পারা মাখিয়া আপিসে যাইব ।

আমার স্ত্রী কহিল , তাহার অপেক্ষা পারা খাইয়া মরা ভালো ।