ব্যঙ্গকৌতুক/সারবান সাহিত্য

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


নাটক

সম্পাদক মহাশয় ,

আজকাল বাংলা সাহিত্যে রাশি রাশি নাটক-নভেলের আমদানি হইতেছে । কিন্তু তাহাতে সার পদার্থ কিছুমাত্র নাই । না আছে তত্ত্বজ্ঞান , না আছে উপদেশ । কী করিলে দেশের ধনবৃদ্ধি হইতে পারে , গোজাতির রোগনিবারণ করিবার কী কী উপায় আছে , দ্বৈত দ্বৈতাদ্বৈত এবং শুদ্ধাদ্বৈতবাদের মধ্যে কোন্‌ বাদ শ্রেষ্ঠ , কফ পিত্ত ও বায়ু-বৃদ্ধির পক্ষে দিশি কুমড়া ও বিলাতি কুমড়ার মধ্যে কোনো প্রভেদ আছে কি না , অশোক এবং হর্ষবর্ধনের মধ্যে কে আগে কে পরে–আমাদের অগণ্য কাব্য - নাটকের মধ্যে এ-সকল সারগর্ভ বিশ্বহিতকর প্রসঙ্গের কোনো মীমাংসা পাওয়া যায় না । একবার কল্পনা করিয়া দেখুন , যদি কোনো নাটকের পঞ্চমাঙ্কের সর্বশেষভাগে এমন একটি তত্ত্ব পাওয়া যায় যদ্দারা জৈবশক্তি ও দৈবশক্তির অন্যোন্য সম্বন্ধ নিরূপিত হয় অথবা সৃষ্টিবিকাশের ক্রমপর্যায় নাটকের অঙ্কে অঙ্কে বিভক্ত হইয়া দুর্গম জ্ঞানশিখরের মরকত-সোপান-পরম্পরা রচিত হয় , তবে রসগ্রাহী সহৃদয় পাঠকেরা কিরূপ পুলকিত ও পরিতৃপ্ত হইতে পারেন । এখন যে-সকল অসার ম্লেচ্ছভাবসংস্পর্শদূষিত গ্রন্থ বাহির হইতেছে তাহা পাঠ করিয়া বাবুরা সাহেব এবং ঘরের গৃহিণীরা বিবি হইতেছেন । বঙ্গসাহিত্যের এই কলঙ্ক অপনোদন করিবার মানসে আমি নাটক-উপন্যাসের ছলে কতকগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ প্রণয়ন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি । প্রথম সংখ্যায় পঞ্জিকা নাট্যাকারে বাহির করিব স্থির করিয়াছি । গ্রহ-ফলাফলের প্রতি বর্তমান কালের ইংরাজি-শিক্ষিত বাবু-বিবিদিগের বিশ্বাস ক্রমশ হ্রাস হইতেছে । সেই নষ্ট বিশ্বাস উদ্ধার করিবার জন্য আমি এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছি । সাধারণের চিত্ত-আকর্ষণের অভিপ্রায়ে এই নাটকের কিঞ্চিৎ নমুনা মহাশয়ের জগদ্‌বিখ্যাত পত্রের এক পার্শ্বে প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি ।



নাটকের পাত্রগণ
হর
পার্বতী
প্রথম অঙ্ক । দৃশ্য কৈলাসপর্বত
হরপার্বতী

পার্বতী । নাথ!

হর । কেন প্রিয়ে ?

পার্বতী । শ্বেতবরাহ কল্পাব্দ হইতে কয়জন মনুর আবির্ভাব হইয়াছে সেই মনোহর প্রসঙ্গ শুনিবার জন্য আমার একান্ত বাসনা হইতেছে ।

হর । ( সহাস্যে) প্রিয়ে , পঞ্জিকার প্রথম সৃষ্টিকাল হইতে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক বর্ষারম্ভদিনে এই পরমজিজ্ঞাস্য প্রশ্নের উত্তরে তোমার কৌতূহল নিবৃত্ত করিয়া আসিতেছি । জীবিতবল্লভে , আজও কি এ সম্বন্ধে তোমার ধারণা জন্মিল না ?

পার্বতী । প্রাণনাথ , জানই তো আমরা বুদ্ধিহীন নারীজাতি , বিশেষত আজকালকার বিবিদের মতো ফিমেল ইস্কুলে পড়ি নাই। (বোধ করি সকলে বুঝিতে পারিয়াছেন , এইখানে বর্তমান শিক্ষিতা মহিলাদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপ করা হইল । ইহাতে স্ত্রীশিক্ষা অনেকটা নিবারণ হইবে ।– লেখক) হৃদয়নাথ , অহর্নিশি একমাত্র পতিচিন্তা ব্যতীত যাহার আর কোনো চিন্তা নাই তাহার স্মৃতিপটে অতগুলা মনুর কথা কিরূপে অঙ্কিত হইবে ? হাজার হউক , তাহারা তো পরপুরুষ বটে । ( বর্তমান কালের পাঠিকারা এইস্থল হইতে পতিভক্তির সুন্দর উপদেশ পাইবেন । – লেখক)

হর । প্রিয়তমে , তবে অবহিত হইয়া মনোহর কথা শ্রবণ করো । শ্বেতবরাহ কল্পাব্দের পর হইতে ছয় জন মনু গত হইয়াছেন। প্রথম স্বায়ম্ভূব মনু । দ্বিতীয় স্বরোচিষ মনু । তৃতীয় ঐত্তমজ মনু । চতুর্থ তামস মনু । পঞ্চম রৈবত মনু । ষষ্ঠ চাক্ষুষ মনু। সম্প্রতি সপ্তম মনু বৈবস্বতের অধিকার চলিতেছে । সপ্তবিংশতি যুগ গত হইয়াছে । অষ্টবিংশতি যুগে কলিযুগের প্রারম্ভ । তত্র চতুর্যুগের পরিমাণ বিংশতিসহস্রাধিক ত্রিচত্বারিংশল্লক্ষ-পরিমিত-বর্ষ ।

পার্বতী । ( স্বগত) অহো কী শ্রুতিমনোহর! (প্রকাশ্যে) প্রাণেশ্বর , এবার সত্যযুগোৎপত্তির কাল নিরূপণ করিয়া দাসীর কর্ণকুহর সুধাসিক্ত করো ।

হর । প্রিয়ে , তবে শ্রবণ করো । বৈশাখ শুক্লপক্ষ অক্ষয়তৃতীয়া রবিবারে সত্যযুগোৎপত্তি । ইত্যাদি ।

(এইরূপে কাব্যকৌশলসহকারে প্রথম অঙ্কে একে একে চারি যুগের উৎপত্তিবিবরণ বর্ণিত হইবে । - লেখক)


দ্বিতীয় অঙ্ক । দৃশ্য কৈলাস

বৃষস্কন্ধে মহেশ এবং শিলাতলে হৈমবতী আসীনা । নাটকের মধ্যে বৈচিত্র্যসাধনের জন্য হরপার্বতীর নাম পরিবর্তন করা গিয়াছে এবং দ্বিতীয় দৃশ্যে বৃষের অবতারণা করা হইয়াছে । যদি কোনো রঙ্গভূমিতে এই নাটকের অভিনয় হয় নিশ্চয়ই বৃষ সাজিবার লোকের অভাব হইবে না । বক্ষ্যমাণ অঙ্কে পার্বতী মধুর সম্ভাষণে মহেশ্বরের নিকট হইতে বর্ষফল জানিয়া লইতেছেন । এই অঙ্কে প্রসঙ্গক্রমে সোনার ভারতের দুর্দশায় পার্বতীর বিলাপ এবং রেলগাড়ি প্রচলিত হওয়াতে আর্যাবর্তের কী কী অনিষ্ট ঘটিয়াছে তাহা কৌশলে বর্ণিত হইয়াছে । অবশেষে আঢ়কেশ ফল কুড়বেশ ফল এবং গোটিকাপাত ফল-নামক সুখশ্রাব্য প্রসঙ্গে এই অঙ্কের সমাপ্তি।



তৃতীয় অঙ্ক এবং চতুর্থ অঙ্ক । দৃশ্য কৈলাস ।
গজচর্মে ত্র্যম্বক ও অম্বিকা আসীনা

নাট্যশালায় গজচর্মের আয়োজন যদি অসম্ভব হয় , কার্পেট পাতিয়া দিলেই চলিবে । এই দুই অঙ্কে বারবেলা , কালবেলা , পরিঘযোগ , বিষ্কম্ভযোগ , অসৃকযোগ , বিষ্টিভদ্রা , মহাদগ্ধা , নক্ষত্রফল , রাশিফল , ববকরণ , বালবকরণ , তৈতিলকরণ , কিন্তুঘ্নকরণ , ঘাতচন্দ্র , তারাপ্রতিকার , গোচরফল প্রভৃতির বর্ণনা আছে । অভিনেতাদিগের প্রতি লেখকের সবিনয় অনুরোধ , এই দুই অঙ্কে তাঁহারা যথাযথ ভাব রক্ষা করিয়া যেন অভিনয় করেন–কারণ অরিদ্বিদশ এবং মিত্রষড়ষ্টক-কথনে যদি অভিনেতার কণ্ঠস্বর ও অঙ্গভঙ্গিতে ভিন্নতা না থাকে , তবে দর্শকগণের চিত্তে কখনোই অনুরূপ ভাব উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিবে না । – লেখক


পঞ্চমাঙ্ক । দৃশ্য কৈলাস
সিংহের উপর ত্রিপুরারি ও মহাদেবী আসীন
(সিংহের অভাবে কাঠের চৌকি হইলে ক্ষতি নাই । – লেখক)

মহাদেবী । প্রভু , দেবদেব , তুমি তো ত্রিকালজ্ঞ , ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান তোমার নখদর্পণে ; এইবার বলো দেখি ১৮৭৯ সালের এক আইনে কী বলে ।

ত্রিপুরারি । মহাদেবী , শুম্ভনিশুম্ভঘাতিনী , তবে অবধান করো । কোনো-একটি বিষয়ের অনেকগুলি দলিল হইলে তাহার মধ্যে প্রধানখানিতে নিয়মিত স্ট্যাম্প , অপরগুলিতে এক টাকা অনুসারে দিতে হয় ।

ইহার পর দলিল রেজিস্টারির খরচা , তামাদির নিয়ম , উকিল-খরচা , খাজনা-বিষয়ক আইন , ইন্‌কম্‌ট্যাক্স , বাঙ্গিডাক , মনিঅর্ডার , সর্বশেষ সাউথ ইস্টার্‌ন্‌ স্টেট রেলওয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়ার কথা বিবৃত করিয়া যবনিকাপতন । এই অঙ্কে যে ব্যক্তি সিংহ সাজিবে তাহার কিঞ্চিৎ আপত্তি থাকিতে পারে ; অতক্ষণ দুই জনকে স্কন্ধে করিয়া হামাগুড়ির ভঙ্গিতে নিশ্চল দাঁড়াইয়া থাকা কঠিন ব্যাপার! সেই জন্য উকিল-খরচা-কথনের মধ্যে সিংহ একবার গর্জন করিয়া উঠিবে , ‘ মা , আমার ক্ষুধা পাইয়াছে । ' মা বলিলেন , ‘ তা , যাও বাছা , সাহারা মরুতে তোমার শিকার ধরিয়া খাও গে , আমরা নীচে নামিয়া বসিতেছি । ' হামাগুড়ি দিয়া সিংহ নিষ্ক্রান্ত হইবে । এই সুযোগে দর্শকেরা সিংহের আবাসস্থলের পরিচয় পাইবেন ।– আমার কোনো কোনো নব্যবন্ধু পরামর্শ দিয়াছিলেন , ইহার মধ্যে মধ্যে নন্দীভৃঙ্গীর হাস্যরসের অবতারণা করিলে ভালো হয় । কিন্তু তাহা হইলে নাটকের গৌরব লাঘব হয়। এইজন্য হাস্যপ্রগল্‌ভতা আমি সযত্নে দূরে পরিহার করিয়াছি । ভবিষ্যতে সুশ্রুত ও চরক-সংহিতা নাট্যাকারে রচনা করিবার অভিলাষ আছে এবং উপন্যাসের ন্যায় লঘু সাহিত্যকে কতদূর পর্যন্ত সারবান করিয়া তোলা যাইতে পারে পাঠকদিগকে তাহারও কিঞ্চিৎ নমুনা দিবার সংকল্প করিয়াছি ।

ভবদীয় একান্ত অনুগত শ্রীজনহিতৈষী

সাহিত্যপ্রচারক